আহনাফ তিহামী, দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:
ময়ূরের পেখম মেলে নাচ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন কুমিল্লার হোমনা উপজেলার নিলখী ইউনিয়নের বাবরকান্দি গ্রামের যুবক মো. শাহ আলী। সেই মুগ্ধতা থেকেই শখের বসে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা দিয়ে এক জোড়া ময়ূর কিনেছিলেন তিনি। এরপর আরও পাঁচটি ময়ূর সংগ্রহ করেন। সেই সাতটি ময়ূর থেকেই বংশবিস্তার করে গড়ে তোলেন ময়ূরের খামার।
বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ৮৫টি ময়ূর। এর মধ্যে ১২টি বড় ময়ূরসহ খামারের ময়ূরগুলোর আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৮ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত প্রায় ২৪ লাখ টাকার ময়ূর বিক্রি করেছেন তিনি। ময়ূর পালনের পাশাপাশি গরু, ছাগল, ভেড়া, তিতির ও কোয়েল পাখিও পালন করছেন শাহ আলী।
বাবরকান্দি গ্রামে ময়ূরের খামারি বলতেই সবাই শাহ আলীকে চেনেন। অনেকে তাঁকে ‘ময়ূর শাহ আলী’ নামেও ডাকেন। সরেজমিনে তাঁর খামারে গিয়ে দেখা যায়, খামারের ভেতর মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে রঙিন ময়ূর। কেউ কেউ পেখম মেলে নাচছে। ময়ূরের সৌন্দর্য দেখতে এবং কিনতে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসেন।
শাহ আলী বলেন, আমি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। ঢাকার বাড্ডায় থাকার সময় বাবা গরুর খামার করেছিলেন। আমি গরুর জন্য ঘাস কেটে দিতাম। পাশাপাশি মিরপুর এলাকায় পাখি কেনাবেচা করতাম। সেখানেই দুটি ময়ূর দেখে ভালো লেগে যায়।
তিনি জানান, পাখি ও গরু বিক্রি করে জমানো টাকা দিয়ে প্রথমে এক জোড়া ময়ূর কেনেন। ওই জোড়া ১৮টি ডিম দেয়। সেখান থেকে ১২টি বাচ্চা ফোটে। পরে গ্রামে ফিরে দুই লাখ টাকা ব্যয়ে দুটি টিনশেড তৈরি করেন। আরও আড়াই লাখ টাকা দিয়ে চারটি নারী ও একটি পুরুষ ময়ূর কেনেন। সাতটি ময়ূর ১৪০টি ডিম দেওয়ার পর সেখান থেকে ১২৮টি বাচ্চা ফোটে।
শাহ আলী বলেন, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ময়ূর কেনা, খাবার, পরিচর্যা ও টিনশেড নির্মাণসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ২৪ লাখ টাকার ময়ূর বিক্রি করেছি। বর্তমানে খামারে প্রায় ২৮ লাখ টাকা মূল্যের ৮৫টি ময়ূর রয়েছে।
ময়ূরের বয়স ও আকারভেদে প্রতি জোড়া ৫০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকার বেশি দামে বিক্রি করেন তিনি। বড় এক জোড়া ময়ূর সর্বোচ্চ ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। প্রতি পালক ২০ থেকে ৫০ টাকা এবং চারটি ডিমের হালি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
ময়ূরের খাবার সম্পর্কে শাহ আলী বলেন, মুরগির খাবারের পাশাপাশি লালশাক, পালং শাক, বাঁধাকপি ও কলমিশাক খাওয়াই। আগে আমি একাই দেখাশোনা করতাম। এখন মাসে ৫ হাজার টাকা বেতনে একজন নারী কর্মী রেখেছি।’ কর্মীর বেতনসহ খামারে মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয় বলে জানান তিনি।
শাহ আলীর পরামর্শ, শুরুতেই বড় পরিসরে ময়ূরের খামার করা উচিত নয়। প্রথমে এক-দুই জোড়া পালন করে অভিজ্ঞতা নেওয়ার পর খামার করার উদ্যোগ নেওয়া ভালো। কারণ ময়ূর যখন-তখন বিক্রি করা যায় না। তাই পাশাপাশি অন্য আয়ের উৎস থাকা প্রয়োজন।
বাবরকান্দি গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, ময়ূরের খামারের কারণে আমাদের গ্রামটিও এখন জেলা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিচিতি পেয়েছে।
হোমনা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শফিকুল আলম বলেন, হোমনা উপজেলায় শাহ আলীরই ময়ূরের খামার রয়েছে। আমরা নিয়মিত তাঁর খামার পরিদর্শন করি এবং সার্বিক সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।
শখের বসে এক জোড়া ময়ূর দিয়ে শুরু করা শাহ আলীর উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে খামারে। ময়ূরের সৌন্দর্য যেমন দর্শনার্থীদের টানছে, তেমনি এর বিক্রিও এনে দিয়েছে আয়। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে খামার করার স্বপ্ন দেখছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।