তাপস চন্দ্র সরকার।।
বিদায়বেলায় ফুলে ফুলে সিক্ত হলেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ তপন বকসী।
দীর্ঘ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক জীবনের ইতি টেনে শনিবার (২২ আগস্ট ২০২৬) বিকেল ৩টায় চান্দিনা উপজেলা সদরের হারং বকসী বাড়ির পারিবারিক শ্মশানে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও যথাযথ মর্যাদায় তাঁর অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া ও শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
শেষ বিদায়ের আগে তাঁকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁর মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। একে একে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান নেতৃবৃন্দ, সহযোদ্ধা, সহকর্মী, স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রিয় মানুষটির মরদেহ ফুলে ফুলে ঢেকে যায়। শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে এসে অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
তাঁর শেষ বিদায়ে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী, আইসিটি সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার আহ্বায়ক কমল চন্দ খোকন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ট্রাস্টি নির্মল পাল, সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র সরকার, আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সজল চন্দ্র পাল, সাংগঠনিক সম্পাদক উত্তম সরকার ও দপ্তর সম্পাদক শম্ভু শীল।
এ ছাড়া বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ আদর্শ সদর উপজেলা শাখার সভাপতি যোগেশ সরকার এবং প্রতিদিনের বাংলাদেশ কুমিল্লা ব্যুরো চিফ অধ্যাপক দিলীপ মজুমদারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিসহ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ এ শেষ বিদায়ে অংশ নেন। সকাল থেকেই হারং বকসী বাড়িতে ছিল শোকাহত মানুষের ভিড়। শেষবারের মতো প্রিয় নেতাকে একনজর দেখতে দূর-দূরান্ত থেকেও ছুটে আসেন অনেকে।
একসময় যাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে মানুষের অধিকার ও সমাজের কল্যাণের কথা, যাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের পক্ষে কাজ করেছেন অনেকে—সেই তপন বকসীকে বিদায় জানাতে শেষ সময়ে হাতে হাতে ছিল ফুল। পুষ্পস্তবক অর্পণের সময় শোকাহত মানুষের মুখে ছিল নীরবতা, চোখে ছিল অশ্রু।
রাজনৈতিক সহকর্মী থেকে শুরু করে সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ—সবাই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মরণ করেন তাঁর কর্মময় জীবন। কারও কাছে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক অভিভাবক, কারও কাছে মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা, আবার কারও কাছে ছিলেন স্নেহশীল ও আপনজন। শেষ বিদায়ের সেই দৃশ্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। ফুলে ফুলে ঢাকা মরদেহ যেন জানান দিচ্ছিল—মানুষটি চলে গেলেও তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রয়ে গেছে।
তপন বকসী ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে মানুষের পাশে থেকেছেন। স্বাধীনতাত্তোর সময়ে তিনি চান্দিনা থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি চান্দিনা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার মানুষের কল্যাণে কাজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক সৌহার্দ্য রক্ষায় তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
তপন বকসীর মৃত্যুতে চান্দিনার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে গভীর শূন্যতা। তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা মনে করেন, একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং সামাজিক অভিভাবককে হারিয়েছে চান্দিনাবাসী। মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো এবং সবার সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই ছিল তপন বকসীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
গত ২০ আগস্ট ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ৭টায় কুমিল্লার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তপন বকসী (৭৩)। তিনি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার হারং বকসী বাড়ির স্বর্গীয় বিধুভূষণ বকসীর পুত্র।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক পুত্র ও দুই কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব, সহযোদ্ধা ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। শনিবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় সম্মান, ফুলেল শ্রদ্ধা আর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় তাঁকে শেষ বিদায় জানানো হয়। জীবনের শেষ প্রহরে ফুলে ফুলে সিক্ত হয়ে বিদায় নেওয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি চান্দিনার মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে।