ব্রাহ্মণপাড়ায় আল বারাকা হাসপাতালে ভুল অস্ত্রোপচারের পর প্রসূতির মৃত্যু, ঘিরে হাসপাতাল ভাঙচুর

গাজী রুবেল।।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় আল বারাকা হাসপাতালে ভুল অস্ত্রোপচার(সিজার) এর পর এক প্রসূতির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তুলে হাসপাতাল ঘেরাও, ভাঙচুর ও বিক্ষোভ করেছেন নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসী। একই সঙ্গে সাহেবাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম্য আদালতের কক্ষে স্থানীয়ভাবে বৈঠক করে সাড়ে ১২ লাখ টাকায় বিষয়টি রফাদফার চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদে বসে এ ধরনের বৈঠক করা যায় কি না, তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

এবিষয়ে সাহেবাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, আইনগত ভাবে আমার পরিষদের গ্রাম্য আদালত পক্ষে এধরণের বৈঠক করতে পারি না। তবে সামাজিক ও মানবিক দিক চিন্তা করে আমরা বিষয়টি মীমাংসা করেছি।

নিহত প্রসূতির নাম মোসা. পপি আক্তার (২১)। তিনি ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সাহেবাবাদ ইউনিয়নের সাহেবাবাদ গ্রামের মো. মোসলেম উদ্দিনের মেয়ে এবং একই ইউনিয়নের টাকই অহিদ সরকার বাড়ির মো. মোহন মিয়ার স্ত্রী। পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রসবব্যথা উঠলে পপি আক্তারকে উপজেলা সদরের আল বারাকা হাসপাতালে (সাবেক ভিশন হাসপাতাল) নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার(সিজার) এর মাধ্যমে তাঁর সন্তান প্রসব করানো হয়। ৭ সেপ্টেম্বর পপি ও তাঁর নবজাতক সন্তানকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। স্বজনদের অভিযোগ, বাড়িতে ফেরার পর থেকেই পপির শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে অস্ত্রোপচারের স্থানের সেলাই কাটার পর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে পুনরায় আল বারাকা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক সেলাই কেটে দিয়ে গুরুতর কোনো সমস্যা নেই বলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন বলে দাবি পরিবারের।পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৩টায় তাঁর অবস্থার আরও অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে পুনরায় অস্ত্রোপচার করেন এবং পরবর্তী সময়ে আইসিইউতে চিকিৎসার পরামর্শ দেন।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা খালি না থাকায় তাঁকে কুমিল্লা শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ভোরে পপি আক্তারের মৃত্যু হয় বলে পরিবার জানিয়েছে।এদিকে, পপির শারীরিক অবস্থার অবনতিকে কেন্দ্র করে ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে আল বারাকা হাসপাতালে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ব্রাহ্মণপাড়া থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে নিহতের মরদেহ নিয়ে স্বজন ও এলাকাবাসী আবারও আল বারাকা হাসপাতালে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় হাসপাতাল ঘেরাও ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার পরামর্শ দেয়।

পরিবারের দাবি, আল বারাকা হাসপাতালে করা অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসায় গাফিলতির কারণেই পপি আক্তারের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা দাবি করেছেন। প্রসূতির মৃত্যুর পর স্থানীয়ভাবে বৈঠক করে বিষয়টি রফাদফার চেষ্টা এবং সাড়ে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে রফাদফার অভিযোগও সামনে এসেছে।

চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর মতো গুরুতর ঘটনায় স্থানীয়ভাবে আর্থিক সমঝোতা হলে এতে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং কার দায় রয়েছে।এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছে।

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বিষয়টি তদন্তের জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের পর আল বারাকা হাসপাতালের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কুমিল্লার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. রেজা মো. সারোয়ার আকবর জানান, বিষয়টি তাঁরা জানতে পেরেছেন। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডা. মনিরুল ইসলামকে বিষয়টি দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন বলেন, ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে ভুল চিকিৎসার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজনরা আল বারাকা হাসপাতালে ভাঙচুর করেন। পরে ১৮ সেপ্টেম্বর রোগীর মৃত্যুর পর স্বজনরা আবার হাসপাতালে ভাঙচুরের চেষ্টা করলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা রোগীর স্বজনদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন তদন্তেই স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা! পপি আক্তারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসার নথিতে কী তথ্য রয়েছে এবং সাড়ে ১২ লাখ টাকার কথিত রফাদফার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বেরিয়ে আসতে পারে ঘটনার প্রকৃত চিত্র।