দাউদকান্দিতে এক শতাংশ জমিতে ৫ ফুট চওড়া ব্যতিক্রমী বসতঘর, দেখতে ভিড় করছেন দূর-দূরান্তের মানুষ

আহনাফ তিহামী, দাউদকান্দি।।
মাত্র এক শতাংশ জমি। দৈর্ঘ্যে ৮৫ ফুট হলেও প্রস্থ মাত্র ৫ ফুট। সীমিত এই জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ব্যতিক্রমী এক বসতঘর নির্মাণ করেছেন সৌদি আরবপ্রবাসী মো. শাহজালাল। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার স্বল্পপেন্নাই গ্রামে নির্মিত এই ঘরের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এটি দেখতে আসছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘরটির জায়গাটি আগে একটি ডোবা ছিল। সেটি ভরাট করে চলতি বছরের জুন মাসে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে টিনের ছাউনি ও বেড়ার এই ঘরটি নির্মাণ করেন শাহজালাল। বর্তমানে এটিই তাঁর পরিবারের একমাত্র স্থায়ী ঠিকানা।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঘরটির প্রবেশমুখে রয়েছে রান্নাঘর। এরপর রয়েছে খাবার ঘর, যেখানে রান্নার সামগ্রী রাখার একটি আলমারি রাখা হয়েছে। পরবর্তী অংশে শোয়ার কক্ষ। সেখানে ছয় ফুট দৈর্ঘ্য ও তিন ফুট প্রস্থের একটি চৌকি রয়েছে। এরপর ওয়্যারড্রোব ও স্টিলের একটি আলমারি রাখার জায়গা। সর্বশেষ অংশে রয়েছে পানি উত্তোলনের মোটর ও শৌচাগার। ঘরের সামনে ১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫ ফুট প্রস্থের চলাচলের পথ এবং পেছনে ১৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫ ফুট প্রস্থের একটি খোলা বসার স্থান রাখা হয়েছে।

৫ ফুট চওড়া এই ঘরেই দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে বসবাস করছেন শাহজালালের স্ত্রী খাদিজা আক্তার। তিনি বলেন, ঘর ছোট হলেও মোটামুটি সব ধরনের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। ছয় ফুট দৈর্ঘ্য ও তিন ফুট প্রস্থের চৌকিতে সন্তানদের নিয়ে রাতে ঘুমান। সবার জায়গা না হওয়ায় চৌকির পাশে মোড়া রেখে তার ওপর কাঠ বিছিয়ে অতিরিক্ত শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

খাদিজা আক্তার জানান, ২০১৩ সালে শাহজালালের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তখন শাহজালাল দেশে মাইক্রোবাস চালাতেন। ২০১৫ সালে তিনি প্রথমে ইরাকে যান। সেখান থেকে তিন বছর পর দেশে ফেরেন। ২০১৬ সালে বাবা শহীদ উল্লাহর কাছ থেকে এক শতাংশ নিচু জমি কেনেন। একই সময়ে পৈত্রিক ভিটায় একটি পাকা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করলে প্রতিবেশী স্বজনেরা জায়গা-সংক্রান্ত একাধিক মামলা দায়ের করেন। একা এসব মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে শাহজালাল সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। পরে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে কখনো স্বজনদের বাড়িতে, আবার কখনো খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাতে হয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তিনি সৌদি আরবে যান। তাঁর পাঠানো টাকায় চলতি বছরের জুন মাসে টিনের ছাউনি ও বেড়ার এই ঘরটি নির্মাণ করা হয়।

ভাইরাল ঘরটি দেখতে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকার মানুষ ভিড় করছেন। স্থানীয় কয়েকজন বলেন এটি সত্যিই ব্যতিক্রমী একটি বসতঘর। নিজের চোখে না দেখলে পরিবারটির দুঃখ-কষ্ট ও সংগ্রামের পাশাপাশি তাদের স্বপ্নপূরণের অনুভূতিও উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

শাহজালালের পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই হওয়ায় খুশি স্থানীয় বাসিন্দারাও। প্রতিবেশী মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, পরিবারটির বসবাসের জন্য কোনো জায়গাই ছিল না। দীর্ঘদিন বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে কষ্ট করে থাকতে হয়েছে। অল্প জায়গার মধ্যেই হলেও অবশেষে শাহজালাল নিজের একটি বসতঘর নির্মাণ করতে পেরেছেন। এতে তাঁদের একটি স্থায়ী ঠিকানা হয়েছে।

গৌরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জাহানারা আক্তার বলেন, শাহজালাল দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকলেও সীমিত আয়ের কারণে পরিবারের ভরণপোষণ শেষে বসতঘর নির্মাণের জন্য আলাদা জায়গা কেনার সামর্থ্য হয়নি। এ ছাড়া স্বল্পপেন্নাই গ্রামে এক শতাংশ ডোবার জমি কিনতেও কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন। তাই নিরুপায় হয়ে পরিবারটি অল্প জায়গার মধ্যেই মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করেছে।