অযত্নে ধ্বংসের পথে দুই শত বছরের জমিদার বাড়ি

আহনাফ তিহামী, দাউদকান্দি প্রতিনিধি:

দুই শত বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে কুমিল্লার তিতাস উপজেলার মজিদপুর জমিদারবাড়ি। একসময় জমিদারদের জৌলুস ও প্রভাব-প্রতিপত্তির সাক্ষী এই বাড়ি এখন অযত্ন, অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের পথে। ভবনের দেয়ালে জন্মেছে আগাছা ও পরগাছা। কোথাও লতা-পাতায় ঢেকে গেছে পুরোনো স্থাপনা। নোনা ধরা দেয়াল থেকে খসে পড়ছে ইট ও চুন-সুরকি।

মজিদপুর গ্রামে অবস্থিত এই জমিদারবাড়ির গোড়াপত্তন করেন শ্রী রামলোচন রায়। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, জমিদারি শাসনের শুরুর দিকে তিনি মজিদপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন। তিতাস, মেঘনা, হোমনা ও মুরাদনগরের বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল তাঁদের জমিদারির আওতায়।

রামলোচন রায়ের তিন ছেলে ছিলেন কালীচরণ রায়, ব্রজেন্দ্র কুমার রায় ও শিবচরণ রায়। তাঁদের বংশধররা প্রায় ২০০ বছর ধরে জমিদারি পরিচালনা করেন। এ বংশের কয়েকজন পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষা ও পেশাগত ক্ষেত্রেও পরিচিতি পান। ক্ষেত্র মোহন রায় তিতাস অঞ্চলের প্রথম গ্র্যাজুয়েট ও আইনজীবী এবং উপেন্দ্র চন্দ্র রায় প্রথম গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক হিসেবে স্থানীয় ইতিহাসে পরিচিত।

একসময় জমিদারবাড়ির বিশাল চত্বরে ছিল ১৭টি অট্টালিকা। ছিল একটি বড় দীঘি ও প্রায় ২০টি ছোট-বড় পুকুর। চুন-সুরকি ও পোড়ামাটির ইটে নির্মিত ভবনগুলোর স্থাপত্যশৈলী এখনো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। তবে সময়ের সঙ্গে কয়েকটি ভবন ধ্বংস হয়েছে, বাকিগুলোও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

এই জমিদার পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি করুণ কাহিনি। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, ব্রজেন্দ্র কুমার রায়ের ছেলে শিরিশ চন্দ্র রায় তাঁর গর্ভবতী স্ত্রীকে হত্যা করার পর মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাঁকে জমিদারবাড়ির একটি প্রকোষ্ঠে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তবে এ ঘটনার প্রামাণ্য দলিল পাওয়া না গেলে এটিকে স্থানীয় জনশ্রুতি হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

ভারত বিভাজন ও পরবর্তীতে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর জমিদার পরিবারের সদস্যরা ভারতে চলে যান। এরপর থেকে অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে বাড়িটি। দীর্ঘদিনের অযত্নে ভবনগুলোর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা তাসীন তিহামীসহ কয়েক জন বলেন, মজিদপুর জমিদারবাড়ি আমাদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। চোখের সামনে ভবনগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখনই সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস শুধু গল্প হয়ে থাকবে। বাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে এটি একটি দর্শনীয় পর্যটনকেন্দ্র হতে পারে।

স্থানীয়দের দাবি, ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে জমিদারবাড়িটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। জরাজীর্ণ ভবনগুলো সংস্কার, সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখলমুক্তকরণ এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে মজিদপুর জমিদারবাড়ি হয়ে উঠতে পারে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান।

দুই শত বছরের পুরোনো এই বাড়ির দেয়ালে আজও অতীতের গল্প লেখা। তবে সময়ের ক্ষত আর অযত্নে সেই গল্প মুছে যাওয়ার আগেই প্রয়োজন সংরক্ষণের উদ্যোগ।