বেইলি সেতু ভেঙে নদীতে, দুর্ভোগে দুই জেলার হাজারো মানুষ

আহনাফ তিহামী, দাউদকান্দি।।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মারুকা ইউনিয়নের খামারপাড়া এবং চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার পিতাম্বর্দী এলাকার সংযোগস্থলে খিরাই নদীর ওপর নির্মিত পিতাম্বর্দী স্টিল (বেইলি) সেতু ভেঙে খালে পড়ায় দুই জেলার হাজারো মানুষের যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দাউদকান্দির অন্তত ছয়টি গ্রামসহ চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। দুর্ঘটনায় কয়েকজন আহত হওয়ার খবরও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

শনিবার (১ আগস্ট) সন্ধ্যায় সেতুটি ধসে পড়ার পর থেকে দাউদকান্দি ও মতলব দক্ষিণ উপজেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষার্থী ও রোগীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। বিভিন্ন স্থানে স্টিলের পাটাতন দেবে যায়, মরিচা ধরে ক্ষয় হয়ে যায় এবং একাধিক স্থানে ছিদ্রের সৃষ্টি হয়। ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে সেতুর অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ে। সম্প্রতি মেরামতের কাজ চলাকালে সেটি ধসে পড়ে।

দাউদকান্দি উপজেলার মারুকা ইউনিয়নের খামারপাড়া, ধারিবন, চশই, পালপাড়া, দিগলগাঁও, ধনেশ্বর ও বরনপাড়াসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ প্রতিদিন এই সেতু ব্যবহার করতেন। অপরদিকে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার পিতাম্বর্দী, নায়েরগাঁও, বকচর, ষোলদানা, কাঁচিয়ারা, বিশ্বাসপুর, নন্দিখোলা, পেয়ারিখোলা, ঘোনা ও তুষপুরসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষেরও এটি ছিল প্রধান যাতায়াতের পথ। এছাড়া কচুয়া উপজেলার বরদৈল, আতিশ্বর, মধুপুর, ভাটিছিনিয়া, সুরাইল ও সাচার এলাকার অনেক মানুষও এই সড়ক ব্যবহার করতেন।

মারুকা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মোহাম্মদ ইসমাইল তালুকদার বলেন, সেতু ভেঙে যাওয়ার পর দুই পাড়ের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন অবহেলা ও সংস্কারের অভাবেই আজ এই পরিণতি হয়েছে।

খামারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাক প্রধান বলেন, এই সেতুর ওপর নির্ভর করে দুই জেলার মানুষ চলাচল করত। এখন যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষিপণ্য ও ব্যবসার মালামাল পরিবহন করা যাচ্ছে না। আমরা দ্রুত নতুন সেতুর টেন্ডার দিয়ে স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী কয়েকজন অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে সেতুর পাটাতন মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে গেলেও কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। তাঁর দাবি, মেরামতের সময় যথাযথ তদারকির অভাবেও দুর্ঘটনা ঘটেছে।

দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ইটবোঝাই বাল্কহেডের মালিক ও সুকানি জুয়েল পাটোয়ারী বলেন, ৪০ হাজার ইট নিয়ে সেতুর নিচে পৌঁছানোর পর হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো সেতু বাল্কহেডের ওপর ভেঙে পড়ে। প্রাণে বেঁচে গেলেও বাল্কহেডের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য মালামাল নদীতে তলিয়ে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় আগে নির্মিত সেতুটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে এর ধারণক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। একাধিকবার সংস্কারের দাবি জানানো হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এদিকে সেতু ভেঙে পড়ায় দাউদকান্দি ও মতলব দক্ষিণ উপজেলার পাশাপাশি কচুয়া, হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ ও চাঁদপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের যাতায়াতে ব্যাপক ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত অস্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু এবং স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে দাউদকান্দি (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, পিতাম্বর্দী বেইলি সেতুটি আমরা খুলে ফেলছিলাম। নতুন একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। সেই নতুন সেতুর নির্মাণকাজের অংশ হিসেবেই পুরোনো বেইলি সেতুটি অপসারণ করা হচ্ছিল। অপসারণের কাজ চলাকালেই সেতুটি হঠাৎ ভেঙে পড়ে।