রাহাদুল ইসলাম সুজন, কুবি।।
“এই দেশে জন্মগ্রহণ করাই আমার আজন্ম পাপ। আমাকে ফাঁসি দেন, রাষ্ট্র আমাকে ফাঁসি দেন—কেন আমি এ দেশে জন্মগ্রহণ করেছি?”— বলে মন্তব্য করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আতিক হাসান অন্তর।
কুবি শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের প্রেস ব্রিফিংকে ‘প্রহসনমূলক’ আখ্যা দিয়ে চার দফা দাবিতে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানববন্ধনে এই কথা বলেন তিনি।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পূর্বঘোষিত চার দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবি জানান। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও পুলিশের দেওয়া প্রেস ব্রিফিং নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ সুপারের (এসপি) দেওয়া প্রেস ব্রিফিংকে তারা ‘প্রহসনমূলক’ মনে করছেন। তাদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। তাই দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেকের শাস্তি নিশ্চিত করা; প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার এবং আদর্শ সদর ও সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) প্রত্যাহার; কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন; এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধারে একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ইউনিট গঠন।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘কুমিল্লাতে মানুষ মরে, পুলিশ মেডেল ধরে’ এবং ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এ সময় বক্তব্য দিতে গিয়ে বাংলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আতিক হাসান অন্তর বলেন, “এই দেশে জন্মগ্রহণ করাই আমার আজন্ম পাপ। আমার কাছে মনে হয়, আমি এই দেশে জন্মগ্রহণ করার কারণে আমাকে ফাঁসি দেন, রাষ্ট্র আমাকে ফাঁসি দেন! কেন আমি এ দেশে জন্মগ্রহণ করেছি?”
তিনি আরও বলেন, “আজকে যদি আমি এখানে মারা যাই, আজকে যদি আমার ওপর কোনো হামলা হয়, আজকে যদি আমি কোনো কারও সন্ত্রাসী দ্বারা হত্যার শিকার হই, আমি জানি আমার বাবা-মা এবং আমি কখনো এটার ন্যায়বিচার পাব না।”
ফার্মেসি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাঈম ভূঁইয়া বলেন, “গতকাল সন্ধ্যায় আনাস নামের একজনকে আটক করার সংবাদ প্রকাশ হলেও আজকে পুলিশ সুপার সেটা অস্বীকার করেছেন। তাছাড়া, এই ঘটনার অনেকগুলো বিষয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা আমাদের চার দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।”
একই শিক্ষাবর্ষের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল বলেন, “গতকাল তুহিনকে গ্রেপ্তারের পর সে আনাসের নাম বলেছে। পরে আনাসকে বেলতলি থেকে আটক করা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু আজকের প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ বলেছে, আনাস নামে কাউকে আটক করা হয়নি।”
তিনি বলেন, “তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়ে থাকলে কেন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তারও কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। একইভাবে সিয়ামের বয়স নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তার বয়স দেখানো হয়েছে ১৫ বছর, অথচ সে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। তার ফেসবুক প্রোফাইলে জন্মতারিখ ১৭ অক্টোবর ২০০৬ দেওয়া আছে। সে হিসেবে তার বয়স ২০ বছর হওয়ার কথা।”
নাজমুল আরও বলেন, “আইফোন নিয়ে অপ্রতিম বের হয়েছিল—এটি সবাই জানে। ১২ ঘণ্টা সময় নেওয়ার পরও পুলিশ দৃশ্যমান কোনো নতুন তথ্য দিতে পারেনি। তুহিনের কাছ থেকে নেওয়া স্বীকারোক্তির বিষয়েও কোনো বক্তব্য বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়নি। তারা শুধু বলছে, তদন্তে আরও সময় লাগবে। এর প্রেক্ষিতেই আমরা কর্মসূচি দিয়েছি।”
মানববন্ধনে বক্তারা অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।