ডেস্ক রিপোর্ট।।
কুমিল্লার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রাক্তন শিক্ষক, ছড়াকার, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং কুমিল্লা সাংস্কৃতিক জোট ও কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি জহিরুল হক দুলাল গত ৬ নভেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত ও বেদনাহত। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক সমবেদনা।
জহিরুল হক দুলাল কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধা কিংবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না; তিনি ছিলেন কুমিল্লার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত এক পরিচিত মুখ। তাঁর জীবন ও কর্মে প্রতিফলিত হয়েছে দেশপ্রেম, সাহসিকতা, সাহিত্যিক সৃজনশীলতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। একজন মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, ছড়াকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে তিনি কুমিল্লার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেমের উত্তরাধিকার
একজন মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় কেবল ১৯৭১ সালের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। মুক্তিযুদ্ধের সাহস, আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের আদর্শকে পরবর্তী জীবনে ধারণ ও সমুন্নত রাখার মধ্য দিয়েই সেই পরিচয়ের পূর্ণতা প্রকাশ পায়।
জহিরুল হক দুলালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং পরবর্তী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ তাঁর দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনার পরিচায়ক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর মতো মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের ঐতিহাসিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
ছড়াকার, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক
জহিরুল হক দুলালের ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর সাহিত্যিক সৃজনশীলতা। ছড়াকার হিসেবে তাঁর পরিচয় দেশপ্রেম, সামাজিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রকাশের একটি বিশেষ মাধ্যম। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্মিলিত উদ্যোগ গড়ে তোলার প্রয়াস তাঁকে বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।
কুমিল্লা সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি হিসেবে তিনি স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সংগঠন ও বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নাট্যচর্চা এবং জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবস উদ্যাপন ও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে তাঁর সম্পৃক্ততা কুমিল্লার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁকে পরিচিত করে তুলেছিল।
কুমিল্লা প্রেস ক্লাব পুনর্গঠন ও আমাদের সাংগঠনিক স্মৃতি
১৯৮৫ সালে আমরা যখন কুমিল্লা প্রেস ক্লাব পুনর্গঠন এবং নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করি, তখন আমাদের চিন্তা কেবল সাংবাদিকদের একটি পেশাগত সংগঠন গড়ে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমাদের লক্ষ্য ছিল সাংবাদিকতাকে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ও জনসেবার অঙ্গীকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
আমরা বিশ্বাস করতাম, সাংবাদিকতার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে স্থানীয় মানুষের কথা বলা, অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের অধিকার ও ন্যায্য দাবিকে গণমাধ্যমে তুলে ধরা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার বিকাশে ভূমিকা রাখা।
সেই সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জহিরুল হক দুলাল ছিলেন একজন সুপরিচিত ছড়াকার ও দক্ষ সংগঠক। কুমিল্লার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর পরিচিতি এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা প্রেস ক্লাবের বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
১৯৯২ সালে আমার দেশত্যাগের পর মরহুম অধ্যাপক আব্দুল ওহাব প্রেস ক্লাবের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তৃণমূল সাংবাদিকতার একজন নিবেদিতপ্রাণ পথিকৃৎ হিসেবে তাঁর সাংবাদিকতা, সম্পাদনা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনসম্পৃক্ত কর্মজীবন কুমিল্লার ইতিহাসে যথাযথ মূল্যায়নের দাবি রাখে। অধ্যাপক আব্দুল ওহাব এবং জহিরুল হক দুলালের মতো ব্যক্তিত্বদের কর্ম ও অবদান পরস্পরকে সম্পূরক করে কুমিল্লার সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নির্মাণ করেছে।
পরিবর্তিত সময়ে সাংবাদিকতার চিরন্তন মূল্যবোধ
জহিরুল হক দুলাল এমন এক সময়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতীয় মূল্যবোধ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনে সাংবাদিকতার ধরন, সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনার পদ্ধতি বদলে যাচ্ছে; কিন্তু সাংবাদিকতার মৌলিক মূল্যবোধ বদলায়নি।
সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই, জনস্বার্থ রক্ষা, নৈতিকতা, মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ক্ষমতার কাছে প্রশ্ন করার সাহস—এসবই সাংবাদিকতার চিরন্তন দায়িত্ব। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার এই মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা আজ অত্যন্ত জরুরি।
স্মৃতি সংরক্ষণ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার
জহিরুল হক দুলালের প্রয়াণ আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, কুমিল্লার সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রবীণ ও প্রয়াত সাংবাদিক, শিক্ষক, লেখক, মুক্তিযোদ্ধা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠকদের জীবন ও কর্ম যদি প্রামাণ্য দলিলে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে সময়ের সঙ্গে তাঁদের অবদান বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে।
এই উপলব্ধি থেকেই কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের নেতৃত্বে “কুমিল্লা সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্য নেটওয়ার্ক (Cumilla Socio-Cultural and Heritage Network)” প্রতিষ্ঠার একটি প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী কুমিল্লাবাসীকে একটি অরাজনৈতিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বেচ্ছাসেবী সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা।
এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কুমিল্লার ইতিহাস, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন ও কর্ম নিয়ে ডিজিটাল আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা, প্রয়াত সাংবাদিকদের অবদান নথিবদ্ধকরণ, গবেষণা ও প্রকাশনা এবং বার্ষিক হেরিটেজ ও ইন্টেলেকচুয়াল কনফারেন্স আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় ৩০টি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত কুমিল্লার প্রবাসীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষভাবে, প্রস্তাবিত Professor Abdul Wahab Institute for Grassroots Journalism এই উদ্যোগের গবেষণা, সাংবাদিকতার ইতিহাস সংরক্ষণ, ডিজিটাল আর্কাইভ, তরুণ সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রকাশনা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে এ বিষয়ে একটি পরামর্শ সভা এবং সমন্বয় কমিটি গঠনের প্রস্তাবও করা হয়েছে।
স্মৃতির মর্যাদা হোক ভবিষ্যতের প্রেরণা
জহিরুল হক দুলালের মৃত্যুতে আমরা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, ছড়াকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠককে হারালাম। তাঁর জীবন ও কর্ম কেবল স্মৃতিচারণের বিষয় নয়; বরং তা কুমিল্লার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিকতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
তাঁর অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন, সহকর্মীদের স্মৃতি সংগ্রহ, সাহিত্যিক সৃজনশীলতা সংরক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
“জহিরুল হক দুলাল কেবল ইতিহাসের একজন সাক্ষী নন; তিনি তাঁদেরই একজন, যাঁদের জীবন ১৯৭১ সালের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের ইতিহাসকে সমকালীন কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিকতার চেতনার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।”
তাঁর স্মৃতির প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা হবে তাঁর আদর্শ, সাংগঠনিক অবদান ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করা এবং মানুষের পক্ষে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার জাহিদ
সভাপতি, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জার্নালিস্টস নেটওয়ার্ক (BNJNet)
সাবেক সভাপতি, কুমিল্লা প্রেস ক্লাব