বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় কুমিল্লায় পালিত হলো শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী মহোৎসব

তাপস চন্দ্র সরকার।।
বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা, আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে কুমিল্লায় পালিত হয়েছে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী মহোৎসব।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) শ্রীশ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটি, কুমিল্লার উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত…’’ পবিত্র শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই অমর বাণীকে সামনে রেখে আয়োজিত এ উৎসবকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা নগরীতে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ ও প্রবীণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় নগরীর রাণীর বাজার রোডস্থ শ্রীশ্রী রাসস্থলী @ রামঠাকুর আশ্রমের প্রধান ফটকের সামনে থেকে বের হয় বর্ণাঢ্য জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা। নানা সাজসজ্জা, ধর্মীয় প্রতীক, ব্যানার-ফেস্টুন, কীর্তন, ধর্মীয় সংগীত ও ভক্তিমূলক পরিবেশনায় শোভাযাত্রাটি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জগন্নাথপুর শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের মন্দিরে এসে শেষ হয়।

শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, কীর্তনের সুর এবং ভক্তদের ‘জয় শ্রীকৃষ্ণ’, ‘হরে কৃষ্ণ’ সহ বিভিন্ন জয়ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো নগরী। শোভাযাত্রায় কৃষ্ণ-রাধার সাজে সজ্জিত শিশুদের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উপস্থাপনা উৎসবে যোগ করে ভিন্নমাত্রা। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে নগরবাসীও বর্ণাঢ্য এ শোভাযাত্রা উপভোগ করেন।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কুমিল্লা মহানগর শাখার সভাপতি ও শ্রীশ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক শ্রী শ্যামল কৃষ্ণ সাহার সভাপতিত্বে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হাজী আমিন-উর রশিদ ইয়াছিন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, শ্রীকৃষ্ণের জীবনাদর্শ ও দর্শন মানুষকে সত্য, ন্যায়, মানবতা, কর্তব্যবোধ ও শান্তির পথে চলার শিক্ষা দেয়। অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার যে চেতনা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শনে রয়েছে, তা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ধারণ করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই চেতনাকে ধারণ করে এ দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের ধর্মীয় উৎসব ও আনন্দে অংশ নিয়ে আসছে। পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় করে একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক ও সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। জন্মাষ্টমীর পবিত্র দিনে তিনি দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও মানুষের কল্যাণ কামনা করেন।

শোভাযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউসূফ মোল্লা টিপু এবং জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিজ রোজী আকতার।

শোভাযাত্রায় আরও অংশ নেন- বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি চন্দন কুমার রায়, সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী ও আইসিটি সম্পাদক এডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার, মহানগর শাখার আহ্বায়ক শ্রী কমল চন্দ খোকন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র সরকার, ইসকন কুমিল্লা জগন্নাথপুর শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের মন্দির কমিটির সভাপতি সুদর্শন জগন্নাথ দাস ব্রহ্মচারী ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্রীমান মৃত্যুঞ্জয় যুধিষ্ঠি দাস ব্রহ্মচারী, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি শ্রী অচিন্ত্য দাশ টিটু, সাধারণ সম্পাদক পিংকু চন্দ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশীষ দাস, মহেশাঙ্গণ শ্রীশ্রী লোকনাথ স্মৃতি তর্পণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক হারাধন ভৌমিক, ডাঃ মধুসূদন রায়, ছাতিপট্টি নৃসিংহ বিগ্রহ মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি প্রদীপ কুমার সাহা, ত্রিশূল উপদেষ্টা ড. বিশ্বজিৎ দেব ও এডভোকেট স্বর্ণকমল নন্দী পলাশ, রামনবমী উদযাপন কমিটির সভাপতি কিশোর দাস, জাগো হিন্দু পরিষদ কুমিল্লার সভাপতি সাগর দাস এবং ত্রিশূল সাধারণ সম্পাদক অনন্য ভৌমিকসহ কুমিল্লা সনাতনী বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর ধর্মীয়, সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। তারা বলেন, শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শনে সত্য, ন্যায়, কর্তব্য, মানবতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার যে শিক্ষা রয়েছে, তা সর্বজনীন। বর্তমান সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজন পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার করা প্রয়োজন।

স্বাগত বক্তব্য দেন শ্রীশ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক শ্রী সঞ্জিত দেবনাথ। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক শ্রী সুব্রত চৌধুরী তপু। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কমিটির সদস্য সচিব দিলীপ কুমার নাগ কানাই।
এদিকে, একই দিন সন্ধ্যায় কুমিল্লার মহেশাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ ও আলোচনা সভা।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ধর্মপ্রাণ মানুষের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় গভীর আধ্যাত্মিক পরিবেশ।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কুমিল্লা মহানগর শাখার সভাপতি ও শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক শ্রী শ্যামল কৃষ্ণ সাহার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল হক চৌধুরী।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউসূফ মোল্লা টিপু, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি চন্দন কুমার রায়।

ধর্মীয় আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন শ্রীকাইল ডিগ্রি কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক শ্রী শ্যামা প্রসাদ ভট্টাচার্য ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ দেব।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র সরকার, ঈশ্বর পাঠশালা স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুধাংশু মজুমদার, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি শ্রী অচিন্ত্য দাশ টিটু, মহেশাঙ্গণ শ্রীশ্রী লোকনাথ স্মৃতি তর্পণ সংঘের সভাপতি ননী গোপাল পাল, ছাতিপট্টি নৃসিংহ বিগ্রহ মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি প্রদীপ কুমার সাহা ও এডভোকেট স্বর্ণকমল নন্দী পলাশসহ কুমিল্লা সনাতনী বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা মানুষের জীবনে সত্য, ন্যায়, কর্তব্য, মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথ দেখায়। গীতার বাণী শুধু ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সংকটময় সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার অনুপ্রেরণাও দেয়।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক পিংকু চন্দ। সঞ্চালনা করেন কমিটির সদস্য সচিব দিলীপ কুমার নাগ কানাই ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্রী সঞ্জিত দেবনাথ।

আলোচনা সভা শেষে অনুষ্ঠিত হয় ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান। ভক্তিগীতি ও ধর্মীয় সংগীতের সুরে অনুষ্ঠানস্থলে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। পরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূজা-অর্চনা শেষে উপস্থিত ভক্ত ও শ্রোতাদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।

দিনব্যাপী এ আয়োজনকে ঘিরে কুমিল্লার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ ও আনন্দ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ, সত্য, ন্যায়, মানবিকতা, শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজকরা।

ভক্তদের কাছে জন্মাষ্টমী শুধু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের স্মরণীয় দিন নয়; এটি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের বিজয়ের প্রত্যাশারও প্রতীক। তাই এবারের জন্মাষ্টমী মহোৎসব কুমিল্লার ভক্তদের হৃদয়ে ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি মানবিকতা, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার গভীর বার্তা রেখে গেছে।

শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, কীর্তনের সুর আর ‘জয় শ্রীকৃষ্ণ’ ধ্বনিতে মুখরিত কুমিল্লা যেন এদিন একসঙ্গে উচ্চারণ করেছে শান্তির জয়, সম্প্রীতির জয়, মানবতার জয়।