দাউদকান্দিতে ৫৮ কোটি টাকার সেতু ঝুলে আছে পাঁচ বছর, দুর্ভোগে ৩০ গ্রামের মানুষ

আহনাফ তিহামী, দাউদকান্দি।।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গোমতী নদীর ওপর নির্মাণাধীন কদমতলী–হাসনাবাদ সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পাঁচ বছর পার হলেও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ। প্রায় ৫৮ কোটি ৭৪ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩১ টাকা ব্যয়ের ৫৭০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর কাজ দুই দফা সময় বাড়িয়েও এখনো শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে দাউদকান্দি, তিতাস ও মেঘনা উপজেলার অন্তত ৩০টি গ্রামের কয়েক লাখ মানুষ প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর দুই তীরে সেতুর বেশ কয়েকটি পিলার নির্মাণ করা হলেও মূল অবকাঠামোর বড় অংশ এখনো অসম্পূর্ণ। প্রকল্পের ১৫২টি পাইলের মধ্যে ১৪১টির কাজ শেষ হলেও ১১টি পাইলের নির্মাণকাজ এখনো বাকি রয়েছে। দক্ষিণাংশে দুটি পিলারের মধ্যে কয়েকটি বিম বসানো ছাড়া দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই কম।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) গোমতী নদীর ওপর কদমতলী–হাসনাবাদ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। কুমিল্লার মঈনউদ্দিন বাশী লিমিটেড ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ (জেভি) যৌথভাবে নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায়। করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কাজ বন্ধ থাকায় ওই বছরের জুলাই মাসে নির্মাণকাজ শুরু হয়।

দরপত্র অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের মে মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে একাধিক দফায় সময় বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। তবে নির্ধারিত সময়েও কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় অর্ধেক কাজ বাকি রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতি, অবহেলা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকির অভাবেই প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে খেয়া নৌকায় গোমতী নদী পার হতে হচ্ছে।

এই সেতু চালু হলে দাউদকান্দি সদর উত্তর ইউনিয়নের পাশাপাশি তিতাস, মেঘনা ও হোমনা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে। বর্তমানে হাসনাবাদ, ভিটিকান্দি, কান্দারগাঁও, ভাজরা, বাহেরচর, গঙ্গাপ্রসাদ, বটতলী, দুধঘাটা, দড়িগাঁও, কাকিয়ালী, চরকাঁঠালিয়া, উজিরাকান্দি, মোহনপুর, সাতানী, চারআনি, নন্দীরচর, বারকাউনিয়া, মঙ্গলকান্দি, কালীরবাজার, ভূঁইয়ার বাজার, নন্দনপুর, বালুয়াকান্দি, জগতপুর, চরকুমারিয়া, আলীপুর, বিনোদপুর, চরবিনোদপুর ও হিজলতলীসহ অন্তত ৩০টি গ্রামের মানুষ নৌকায় নদী পারাপার করছেন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, যথাসময়ে কাজ শুরু ও পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন হলে সেতুটি অনেক আগেই চালু হওয়ার কথা ছিল। এখন উপজেলা সদর কিংবা পাশের ইউনিয়নে যেতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

নৌকায় পার হওয়ার সময় স্থানীয় বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন বলেন, প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসে। দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে।

এদিকে দাউদকান্দি উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, গত জুন মাসের ১৬ তারিখে এটির টেন্ডার বাতিল করা হয়েছে। টেন্ডার বাতিলের পর কিছু নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, বর্তমানে সেই কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ঠিকাদার এ পর্যন্ত কত টাকার কাজ সম্পন্ন করেছেন, তা নির্ধারণের জন্য একটি যৌথ পরিমাপ জয়েন্ট মেজারমেন্ট করা হবে। এরপর ঠিকাদারের ওপর কত টাকা জরিমানা আরোপ করা হবে, সেটিও নির্ধারণ করা হবে। জরিমানা কর্তনের পর অবশিষ্ট কাজের এস্টিমেট উপজেলা অফিস, জেলা অফিস ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন দপ্তরের সমন্বয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে খুব শিগগিরই নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হবে।

এলাকাবাসীর দাবি, বহু প্রতীক্ষিত কদমতলী–হাসনাবাদ সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করে জনদুর্ভোগের অবসান ঘটাতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সেতুটি চালু হলে দাউদকান্দি, তিতাস ও মেঘনা উপজেলার হাজারো মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন গতি আসবে এবং শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে।