স্টাফ রিপোর্টার।।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৬টি সংযোগ সড়কের আমূল পরিবর্তন করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বিশিষ্ট সমাজসেবক গোলাম সারোয়ার।
ইউনিয়নের শিকারপুর গ্রামের প্রখ্যাত দানবীর ও শিক্ষানুরাগী মরহুম জুনাব আলীর কনিষ্ঠ পুত্র গোলাম সারোয়ার তাঁর পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিজ এলাকায় এক মানবিক কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘আমেনা-জুনাব আলী ফাউন্ডেশন’ এর মাধ্যমে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে দীর্ঘদিনের বেহাল ও জনদুর্ভোগে থাকা ১৬টি গ্রামীণ সংযোগ সড়ক সংস্কার ও মেরামত করা হয়েছে। একই সাথে বর্ষার জলাবদ্ধতা দূরীকরণে নির্মাণ করা হয়েছে চারটি টেকসই ড্রেন, কালভার্ট ও গাইডওয়াল। আমেনা-জুনাব আলী ফাউন্ডেশনের এই যুগান্তকারী উন্নয়নমূলক ও মানবিক কাজের সুফল পেয়ে এখন মহাখুশি স্থানীয় বাসিন্দারা, সর্বত্রই চলছে গোলাম সারোয়ারের ভূয়সী প্রশংসা।
মোকাম ইউনিয়নের ২৭টি গ্রামের মধ্যে যে সকল গ্রামের বেহাল দশার সংযোগ সড়কগুলোর মেরামত, সংস্কার ও নতুন করে তৈরি এবং ড্রেন কালভার্ট গাইডওয়াল করা হয়েছে এগুলো হচ্ছে -কাবিলা বাজার কোল্ডস্টোরের সংযোগ সড়ক, শিকারপুর হতে বাড়াইল চিতাখোলা পর্যন্ত, শিকারপুর হতে নতুন বানার বাড়ি পর্যন্ত, বাড়াইল চিতাখোলা হতে লোদন গ্রামের রহিম মেম্বারের বাড়ি পর্যন্ত, শিকারপুর জারিয়া এগ্রো ফার্ম হতে মুরগির ফার্ম পর্যন্ত, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মনিপুর গ্রাম হতে চাঁনগাছা পর্যন্ত, চাঁনগাছা লতিফ মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত, ভারিকোটা-চিতা খোলা হতে শিকারপুর পর্যন্ত, কাবিলা বাজার হতে চাঁনগাছা জামে মসজিদ পর্যন্ত ও দুটি বক্স কালভার্ট নির্মাণ, কোরপাই মিলগেইট হতে কাকিয়ার চর রফিজ উদ্দিন চেয়ারম্যানের বাড়ির পর্যন্ত, পাঁচকিত্তা পূর্বপাড়া জামে মসজিদ হতে ইলিয়াসের বাড়ি পর্যন্ত, মনিপুর পশ্চিম পাড়ায় জামে মসজিদের নতুন ড্রেন নির্মাণ, ভারিকোটা পাকা সড়ক হতে দোকান ঘর এবং জামে মসজিদ পর্যন্ত, পাঁচকিত্তা হতে জঙ্গালিয়া যাওয়ার মাঝখানের অংশ, পাচকিত্তা প্রাইমারি স্কুলের পূর্ব দিক হতে মনশাসনের জলা পর্যন্ত নতুন ড্রেন নির্মাণ, কাকিয়ার চর মধ্যপাড়া সানাউল্লার বাড়ির সামনে হতে কাসেমের বাড়ি পর্যন্ত এবং ভারিকোটায় মোহন মেম্বার, আর্মি অলিউল্লাহ ও আব্দুল বারেকের বাড়ির সামনে চলাচলের রাস্তা রক্ষার্থে গাইডওয়াল নির্মাণ।
এছাড়াও শিকারপুর গ্রামের শেষ মাথা থেকে বাড়াইরের এক কিলোমিটার ফসলি জমির প্রায় দুই ফুট চওড়া আইল ছিল, কাদা মাড়িয়ে চলতে হতো। গাড়ি দূরে থাক, মানুষের হাঁটার ব্যবস্থাও ছিল না। সরকারি উদ্যোগ না থাকায় গোলাম সারোয়ার জমির আইলটি ১৫ ফুট চওড়া সড়কে দৃশ্যমান রূপ দেন। এখন এই সড়কে ১৫ গ্রামের মানুষের জন্য কৃষি পণ্য বহন, রোগীকে জরুরি হাসপাতালে নেওয়া ও বাজারে গবাদিপশুসহ যাতায়াত সহজ হয়েছে।
বিশেষ করে সড়কগুলোর এই আমূল পরিবর্তনের ফলে গ্রামীণ যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। এখনকার কৃষকরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য দেশের অন্যতম বৃহত্তম সবজি বাজার নিমসারে এবং গবাদি পশুর হাট ময়নামতির সাবের বাজারে নিয়ে যেতে পারছেন। কেবল তাই নয়, সংযোগ সড়কগুলোর এই বেহাল দশার কারণে আত্মীয়-স্বজনরাও গ্রামে আসতে চাইত না, সামাজিক সম্পর্কগুলোও কেমন যেন দূরত্বে রূপ নিয়েছিল। এখন সড়কগুলো মেরামত হওয়ায় ধরনের সম্পর্কের ও ব্যাপক উত্তরণ ঘটেছে। স্থানীয়রা জানান, এই সড়কগুলো সংস্কারের ফলে শুধু অর্থনৈতিক সুবাতাসই বইছে না, বরং সুন্দর ও মসৃণ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় গ্রামগুলোর মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের এক নতুন সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে।
গ্রামীন যোগাযোগ ব্যবস্থার এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে নিমসার গ্রামের বাসিন্দা নিমসার জুনাব আলী কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি এডভোকেট শরিফুল ইসলাম বলেন, একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। আমাদের এই সংযোগ সড়কগুলোর বেহাল দশার কারণে পুরো এলাকার উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়েছিল। বর্ষা এলে আমাদের দুর্ভোগের কোনো সীমা থাকত না। সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে সমাজ হিতৈষী মানবিক ব্যক্তি গোলাম সারোয়ার যেভাবে নিজস্ব অর্থ ব্যয়ে ১৬টি সড়ক ও ড্রেন-কালভার্ট সংস্কার করে দিলেন, তা সত্যি এক বিরল ও অনন্য দৃষ্টান্ত। এলাকার সর্বস্তরের মানুষ তাঁর এই মহতী কাজের প্রতি কৃতজ্ঞ।
মোকাম ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা জানান, গ্রামের সংযোগ সড়কগুলোর বেহাল দশার কারণে মাঠ থেকে ফসল বাজারে আনা ছিল এক বড় যুদ্ধ। এখন গোলাম সারোয়ারের এই মহতী উদ্যোগে সংযোগ সড়কগুলো মেরামত ও সংস্কার হওয়ায় কৃষকেরা খুব সহজেই তাদের উৎপাদিত পণ্য দেশের অন্যতম বৃহৎ সবজি বাজার নিমসারে এবং আশপাশের অন্যান্য বাজারে নিয়ে যেতে পারছেন। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি যেমন আরও চাঙ্গা হচ্ছে, তেমনি বাজারে সবজির সরবরাহ ও যোগান অনেক বেড়েছে। এই সড়কগুলো বিশেষ করে মোকাম ইউনিয়নের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক উপকার বয়ে এনেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে এধরণের মহতী ও মানবিক কাজ করার বিষয়ে সমাজহিতৈষী আলহাজ্ব গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘আমি বুড়িচংয়ের মোকাম ইউনিয়নের সন্তান। এই ইউনিয়নের ২৭টি গ্রামের ধুলোমাটি আমার গায়ে মিশে আছে। মোকামের অবহেলিত সংযোগ সড়কগুলোর কারণে আমাদের গ্রামের মানুষের কষ্ট ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক স্থবিরতা আমি নিজে চোখে দেখেছি। আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা প্রয়াত আলহাজ্ব জুনাব আলী সারা জীবন এই অঞ্চলের শিক্ষা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তিনি বলতেন ‘নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেয়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করা সবচেয়ে বড় ইবাদত।’ আরেকটি কথা বলতেন-‘নিজের কর্মের মাধ্যমে মরার পরে জিন্দা থাকতে হবে।’ আমি কেবল আমার পিতার রেখে যাওয়া সেই আদর্শ ও স্বপ্নের পথ ধরে হাঁটার চেষ্টা করছি। আর সেই দায়বোধ থেকেই আমেনা-জুনাব আলী ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মোকাম ইউনিয়নের ১৬টি সড়ক ও চারটি ড্রেন-কালভার্ট সংস্কারের উদ্যোগ নিই। এর আগে আরো কয়েকটি সড়কও মেরামত সংস্কার করেছি। আমার এই প্রচেষ্টা কোনো প্রচার বা সুনামের জন্য নয়, এটি আমার ইউনিয়নের প্রতি, আমার পিতার স্মৃতি বিজড়িত এই মাটির প্রতি পরম দায়িত্ব ও ঋণ শোধের একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। আমি বিশ্বাস করি, মানুষের সেবার মাঝেই লুকিয়ে আছে স্রষ্টার সন্তুষ্টি।’