সংসারের অভাবে ৭৫ বছর বয়সেও পায়ে হেঁটে জীবনসংগ্রাম

আহনাফ তিহামী, দাউদকান্দি।।
বয়স ৭৫ বছর। এই বয়সে অনেকে যখন জীবনের নানা ব্যস্ততা থেকে অবসর নিয়ে পরিবারের স্বজনদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন অমূল্য চন্দ্র সরকারকে প্রতিদিন সকালেই বের হতে হয়। কাঁধে কিংবা হাতে মাটির তৈরি নানা সামগ্রী নিয়ে পায়ে হেঁটে ছুটে চলেন এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। সংসারের অভাব, ধারদেনা আর পরিবারের দায়িত্বের ভার এখনো তাঁকে থামতে দেয়নি।

অমূল্য চন্দ্র সরকারের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকন্দি উপজেলার মালিগাঁও ইউনিয়নের বুরবুরিয়া গ্রামে। প্রায় ৫৫ বছর ধরে মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। প্রতিদিন সকাল নয়টার দিকে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর পায়ে হেঁটে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে এসব সামগ্রী বিক্রি করেন। কখনো কখনো চাঁদপুরের সাচার বাজারের দিকেও যান।

অমূল্য জানান, সংসারের অভাবের কারণে তাঁকে নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে। একসময় অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। পরে ধারদেনা করে চার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলেকেও অনেক কষ্ট করে ঋণ করে বিদেশে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ছেলে এখন তাঁকে তেমনভাবে সহযোগিতা করতে পারছেন না। ফলে বয়স ৭৫ বছর হলেও সংসার চালাতে এখনো তাঁকেই কাজ করে যেতে হচ্ছে।

প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০টি মাটির সামগ্রী বিক্রি করতে পারেন অমূল্য। তবে সব সময় নগদ টাকা পান না। অনেক সময় ক্রেতার কাছে টাকা না থাকলে টাকার পরিবর্তে চালও নিয়ে থাকেন তিনি। সেই চাল দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন।

মাটির তৈরি তাওয়া ৫০ টাকা, ঢাকনা বা হরা ৩৫ থেকে ৬০ টাকা, আর মাটির তৈরি বিভিন্ন পাত্র ও সামগ্রী ৫০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করেন তিনি। রান্না ও খাবারের জন্য ব্যবহৃত হাঁড়ি, পাতিল, সরা, মালসা, বাটি, থালা, গ্লাস, পেয়ালা, পিঠা তৈরির ছাঁচসহ বিভিন্ন সামগ্রীও তাঁর কাছে পাওয়া যায়। এসব মাটির সামগ্রী তিনি মুরাদনগর উপজেলার বাবুটিপাড়া এলাকা থেকে কিনে আনেন। পরে সেগুলো নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন।

দাউদকন্দি উপজেলার চাপাতলী, হাটখোলা, থৈরখোলা, লখাইতলী, তালেরছেওসহ বিভিন্ন গ্রামে নিয়মিত যান অমূল্য। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় পায়ে হেঁটে। বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সঙ্গ না দিলেও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই তাঁকে পথে নামতে হয়।

অমূল্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় গ্রামবাংলার মানুষের ঘরে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল ও নানা ধরনের সামগ্রীর ব্যাপক ব্যবহার ছিল। রান্না থেকে শুরু করে খাবার পরিবেশন প্রায় সব কাজেই মাটির পাত্রের ব্যবহার দেখা যেত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও অন্যান্য আধুনিক সামগ্রীর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মাটির জিনিসের চাহিদা অনেক কমে গেছে।

অমূল্য চন্দ্র সরকার বলেন, আগের মতো এখন আর মাটির জিনিস বিক্রি হয় না। আগে মানুষের চাহিদা বেশি ছিল। এখন অনেকেই এসব জিনিস ব্যবহার করেন না। তবে গ্রামের অনেক মানুষ এখনো শখ করে মাটির তৈরি জিনিস কেনেন ও ব্যবহার করেন।

তাঁর জীবনের গল্প শুধু একজন ফেরিওয়ালার গল্প নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সংগ্রাম। চার মেয়ের বিয়ে, ছেলেকে বিদেশে পাঠানো, সংসারের ধারদেনা সবকিছুর পরও থেমে যাননি তিনি। অভাবের সংসারে নিজের শ্রমকেই অবলম্বন করে চলেছেন।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পায়ে হেঁটে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মাটির সামগ্রী বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়েই কোনোভাবে চলে তাঁর সংসার। বয়সের ভার আর অভাবের চাপ তাঁকে ক্লান্ত করে, কিন্তু জীবিকার পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি।

মাটির তৈরি সামগ্রীর চাহিদা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অমূল্যের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবনও কঠিন হয়ে উঠেছে। তবু ঐতিহ্যবাহী মাটির সামগ্রী নিয়ে তিনি এখনো ছুটে চলেছেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। হয়তো একদিন তাঁর শরীর আর পায়ে হাঁটার অনুমতি দেবে না। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত মাটির তৈরি জিনিসপত্রের বোঝা হাতে নিয়েই জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যেতে চান ৭৫ বছরের এই প্রবীণ।