সৈয়দ খলিলুর রহমান বাবুল।।
ক্যানসার শব্দটাই যেন এক জমাট বাঁধা অন্ধকার। যে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে এক বুক শারীরিক যন্ত্রণা আর একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে দেওয়া চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়। কিন্তু সেই অন্ধকার সমাজকে গ্রাস করতে পারে না, যখন সেখানে ড. জেসমিন পারভীন সীমার মতো কোনো ক্যানসারজয়ী আলোর মশাল হাতে এসে দাঁড়ান। নিজের জীবনের কঠিনতম লড়াইয়ে জয়ী হয়ে এবার তিনি দাঁড়িয়েছেন নিজ জনপদের অন্য ক্যানসার আক্রান্ত অসহায় মানুষদের পাশে। এক আবেগঘন আয়োজনে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন—ক্যানসার মানেই জীবনের শেষ নয়; মনোবল আর সামাজিক সমর্থন থাকলে এই মরণব্যাধিকেও জয় করা সম্ভব।
শুক্রবার বিকেল ৩টায় কুমিল্লার দেবিদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজ মিলনায়তনে বসেছিল এক অন্যরকম মানবিকতার আয়োজন। ‘রেইজ ইয়োর হ্যান্ডস ফর নিডি ক্যানসার পেশেন্টস’ গ্রুপ এবং ‘দেবিদ্বার উপজেলা জনকল্যাণ পরিষদ’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন ৩৮ জন অসহায় ও দরিদ্র ক্যানসার রোগী। গলা, ফুসফুস, স্তন, জরায়ু, ব্লাড ও ব্রেইন ক্যানসারের মতো জটিল রোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এই মানুষগুলোর চোখে ছিল ক্লান্তি, কিন্তু মনে ছিল বাঁচার আকুতি। সেই আকাঙ্ক্ষায় আশার আলো জ্বালাতেই আয়োজকরা তাঁদের পাশে দাঁড়ান মানবিক সহমর্মিতা নিয়ে।

অনুষ্ঠানটির মূল চালিকাশক্তি, সরকারি বাঙলা কলেজ মীরপুর এর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জেসমিন পারভীন সীমা নিজেও একজন ক্যানসারজয়ী যোদ্ধা। নিজের জীবনের সেই ভয়াল অভিজ্ঞতাকে শক্তি হিসেবে কাজে লাগিয়েই তিনি আজ অন্যদের বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
সভাপতির বক্তব্যে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন,“আমি নিজেও একজন ক্যানসার আক্রান্ত মানুষ। নিজের জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা থেকেই সমাজের এই মানুষগুলোর প্রতি আমার ক্ষুদ্র দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি। তাঁদের মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারা এবং তাঁদের লড়াইয়ে শামিল হতে পারাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। সমাজের সামর্থ্যবান প্রত্যেকে যদি এভাবে এগিয়ে আসেন, তবে কোনো ক্যানসার রোগী আর নিজেকে একা ভাববেন না।”

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং দেবিদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আহসান পারভেজ। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন,“ক্যানসার মানেই শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, একটি মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারের জন্য এটি চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার সামাজিক দায়িত্ব।”
তিনি ক্যানসার আক্রান্তদের নিজেদের অসহায় না ভেবে ড. সীমার মতো সাহসী যোদ্ধা হওয়ার আহ্বান জানান।
মো. সফিউল্লাহ সোহাগের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আব্দুস সালাম মুন্সী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বরুণ চন্দ্র দে, বিশিষ্ট রাজনীতিক মো. আনোয়ার হোসেন ভুলু পাঠান, দেবিদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সৈয়দ খলিলুর রহমান বাবুল, সমাজসেবক মো. মোজাফ্ফর আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, সাংবাদিক আতিকুর রহমান বাশার এবং ক্যানসার আক্রান্ত মো. শাহ আলম। এছাড়া ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতামূলক ও দিকনির্দেশনামূলক পরামর্শ দেন ডা. মো. আল আমিন ও ডা. মো. সাহেদ কামাল।
অনুষ্ঠানে কেবল মুখের কথায় সান্ত্বনা দেওয়া হয়নি; বাস্তব সহায়তার হাতও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। উপস্থিত ৩৮ জন রোগীর প্রত্যেককে চিকিৎসার জরুরি খরচের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে নগদ ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
শুধু সাময়িক আর্থিক সহায়তাই নয়, রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিতরণ করা হয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক বিভিন্ন ভেষজ ও ঔষধি গাছের চারা, পাতা এবং ফল ও সবজির বীজ। পাশাপাশি এসব উপাদান কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরামর্শ দেওয়া হয়।
সহায়তা নিতে আসা এক বৃদ্ধ ক্যানসার রোগীর স্বজন নগদ অর্থ ও ঔষধি চারা হাতে নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন,“ক্যানসারের চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে আমরা পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। এই বিপদের দিনে এভাবে কেউ ভালোবেসে পাশে দাঁড়াবে, তা ভাবিনি। এই সহায়তা আমাদের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সাহস দেবে।”
এক বুক মানবিকতা আর ভালোবাসার চাদরে মোড়ানো এই আয়োজনটি দেবিদ্বারে একটি বার্তা দিয়ে গেল—রোগ হয়তো শরীরকে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু সমাজের সম্মিলিত ভালোবাসা ও ইচ্ছাশক্তির কাছে পরাজয় মানতে বাধ্য যেকোনো মরণব্যাধি।