নি‌জের গড়া মসজিদের পাশেই অনন্ত শয্যা নিলেন শিক্ষক গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী

সৈয়দ খ‌লিলুর রহমান।।
​”মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই,
যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।”
​জাতীয় কবি কাজী নজরুলের সেই কালজয়ী গানের পংক্তিগুলো কেবল সুরের মূর্ছনা হয়ে থাকেনি; তা যেন এক অমলিন বাতিঘর হয়ে আলো ছড়িয়েছে এক অনন্য মানুষের হৃদয়ে।
কবর থেকে সেই চিরচেনা আজানের মধুর ধ্বনি শোনার আকুল ব্যাকুলতা যে মানুষকে কতটা উঁচুতে তুলে নিতে পারে, তা যেন স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বৈষয়িক চাহিদাকে পেছনে ফেলে, জীবনের গোধূলিবেলায় নিজের সারা জীবনের অর্জিত পেনশনের শেষ সম্বলটুকু নিঃসংকোচে উজার করে দিয়েছিলেন তিনি। পাশে পেয়েছিলেন প্রিয় সহধর্মিণীকে। দুজনে মিলে গড়ে তুললেন এক নূরানি মসজিদ ও মাদ্রাসা। আর সেই পুণ্যভূমির পাশেই পরম মমতায় পাতলেন নিজের চিরন্তন সমাধি।

​বলছিলাম কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ওয়াহেদপুর ইসলামীয়া আলিম মাদ্রাসার ইসলামের ইতিহাস বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মাওলানা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর কথা। বুধবার সকাল ৮টায় রাজধানীর কুর্মিটোলার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ওপারে পাড়ি জমান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।

​মাওলানা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বেড়াখলা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী বাড়ির সন্তান। তাঁর বাবার নাম মরহুম আলী আহম্মদ চৌধুরী।

​বুধবার বিকেল ৪টায় দেবিদ্বার সদরের চান মিয়া মার্কেটে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বাদ আসর তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ওয়াহেদপুর ইসলামীয়া আলিম মাদ্রাসা মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে শিক্ষককে শেষ বিদায় জানাতে এসে অঝোরে কেঁদেছেন হাজারও মানুষ। চোখের জলে সিক্ত করেছেন চারপাশ। পরবর্তীতে নিজ গ্রাম বেড়াখলা মাঠে তৃতীয় জানাজা শেষে নিজের হাতে গড়া সেই প্রিয় মসজিদ ও মাদ্রাসার শীতল ছায়ায় তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
​ব্যক্তিজীবনে মাওলানা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন এক অনন্য বিনয়, পরোপকার ও অমায়িক স্বভাবের প্রতীক। নিয়তির বিধানে তাঁর নিজের কোনো সন্তান ছিল না। তবে ক্লাসরুমের সেই শত শত শিক্ষার্থী আর শুভানুধ্যায়ীরাই ছিলেন তাঁর হৃদয়ের টুকরো সন্তান। পেনশনের এক কড়িক্রান্তিও নিজের জাঁকজমক বা ভবিষ্যতের মোহে আটকে রাখেননি; পুরোটাই সঁপে দিয়েছিলেন আল্লাহর ঘর ও দ্বীনি আলোকবর্তিকা গড়ার কাজে।

​মৃত্যুকালে তিনি সহধর্মিনী ফরিদা ইয়াসমিনসহ হাজারো ছাত্র ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। পার্থিব কোনো রক্তসম্পর্কিত সন্তান না থাকলেও, আজ শত শত মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায় ও গভীর ভালোবাসায় চিরশান্তির ঠিকানায় চলে গেলেন আলো ছড়ানো এই মহান শিক্ষক।