তাছকিয়া রহমান প্রতিভা, দেবীদ্বার।
কুমিল্লার দেবীদ্বারে মামলা তদন্তে যাওয়া এক পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে মায়ের ষ্ট্রোক। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ দিন চিকিৎসা সেবা দেয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হলেও চিকিৎসা খরচ মেটাতে না পেরে বৃহস্পতিবার ৮ অক্টোবর রাতে বাড়ি নিয়ে আসার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই অর্থাৎ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুর ১২ টায় তিনি মারা যান।
এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের পরিবার ও পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার পর থেকে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আজ শুক্রবার বাদ আসর নিহতার জানাযা শেষে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
নিহত নারী হাসনা বেগম (৫৬) দেবীদ্বার পৌর এলাকার ভূষণা গ্রামের নেহাল কাজীর বাড়ী আব্দুল আজিজের স্ত্রী।
স্থানীয়রা জানান, গত ২০ সেপ্টেম্বর দুপুরে বাড়ির পাশের একটি গর্ত সেচে আক্তারের ছেলে মো. শুভ মাছ ধরছিল। এ সময় ওই বাড়ির মৃত সিরাজুল ইসলামের ছেলে ট্রাক্টর চালক নবী নেওয়াজ (৩৮) মাছগুলো ফেলে দিয়ে নিজেই মাছ ধরতে যায়। এসময় শুভসহ স্থানীয়দের মধ্যে বাগবিতন্ডা ও হাতাহাতি হয়। এসময় শুভর লোকজন নবী নেওয়াজকে মারধর করে।
ওইদিন বিকেলে নবীনেওয়াজ ৬ টি সিএনজি যোগে বহিরাগত ভাড়াটে সন্ত্রাসী প্রায় ৫০/৬০ জন নিয়ে শুভদের বাড়িতে অতর্কীত হামলা চালায়। এসময় সন্ত্রাসীরা বাড়ি ঘর কুপিয়ে ভাংচুর লুটপাটই নয় শুভদের পরিবারের লোকদের বেধরক কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করে। আহতদের মধ্যে শুভ ও তার পিতা আক্তার হোসেন(৩৮)কে কুপিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে ফেলে তার চোয়ালের সামনের ৩ টি দাত ভেঙ্গে ফেলে। ঘরের মেঝেতে পায়খানা – প্রশ্রাব করলেও সন্ত্রাসীদের মারধর বন্ধ হয়নি। সন্ত্রাসীদের বাবা বলে, হাতে পায়ে ধরেও প্রাণ ভিক্ষা চেয়েও রক্ষা পায়নি। সন্ত্রাসীরা মরে গেছে ভেবে পালিয়ে যায়। পরে অচেতন অবস্থায় তাকে দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে কুমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।তার পায়ের কাটা অংশে ৩৮টি সেলাই করতে হয়। গ্রামবাসী খবর পেয়ে সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে উপজেলার ধামতী গ্রামের আব্দুল কাদের নামে এক সন্ত্রাসীকে আটক করে রাখে। সংবাদ পেয়ে দেবীদ্বার থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আটক সন্ত্রাসী আ. কাদের(৪০)কে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
ওই ঘটনায় পর দিন ২১ সেপ্টেম্বর আহত আক্তরের ছোট ভাই আল আমিন বাদী হয়ে নবী নেওয়াজ ও হামলাকারীদের নেতা আব্দুল কাদেরসহ ৬জনকে এজহার নামীয় ও অজ্ঞাতনামা অনেককে দেখিয়ে থানায় মামলা করেন।
মামলা দায়েরের পর বহিরাগত সন্ত্রাসীরা বাদী পক্ষকে নানাভাবে প্রাণ নাশের হুমকী দেয়। মামলার মূল অভিযুক্তের বড়ভাই দুলাল এর উদ্যোগে দু’পক্ষের উত্তেজনা উপশমে সামাজিক সালিশ ডেকে সমাধান করেন।অপর দিকে নবী নেওয়াজও তাকে মারধরের ঘটনায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র থানায় দায়ের করেন।
গত ৬ অক্টোবর মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা অজয় চক্রবর্তী মামলা তদন্তে ভূষণা গ্রামে যান। আসামীর বাড়িতে দির্ঘসময় অবস্থান শেষে বাদীর বাড়ির দিকে আসলে, মামলার বাদীর মা’ হাসনা বেগম ভেবেছে আসামীর পক্ষের অভিযোগে তার ছেলেকে গ্রেফতার করতে পুলিশ আসছে। মা’ চিৎকার করে তার ছেলেদের সরেযেতে বলেই স্ট্রোক করে অচেতন হয়ে পড়েন।
মামলার বাদী আল আমিন জানান, আমার মা’ পুলিশ দেখে গ্রেফতার আতঙ্কে স্ট্রোক করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। দারোগা এসআই অজয় চক্রবর্ত্তী এসে আমার ভাইকে বলেন, তুমি বৃদ্ধ হয়ে গেছ, বৃদ্ধ মানুষের দাঁত এমনিতেই পড়ে যায়। তোমার মামলাও দূর্বল, মামলায় ফুলা জখম উল্লেখ আছে, তাছাড়া ভেন চালিয়ে ভাত খাও, তোমরা মামলা চালাবে কিভাবে? তাই তোমরা আপোষে চলে যাও। তখন আমি দারোগাকে বলি যে, আমার ভাইসহ কয়েকজনকে কুপিয়ে যখম করল, কুপের দাগ হাড় পর্যন্ত বিধেছে একটি কুপের অংশে ৩৮টি সেলাই দিতে হয়েছে, তা ছাড়া ভাইয়ের ৩ টি দাঁত ফেলে দিল, তারপরও এসব কথা মামলায় উল্লখ করেননাই, তদন্তের পর চার্জশীটে উঠাবেন। এখন বলছেন- এমামলায় কিছু হবেনা।
তিনি আমার অভিযোগটি ফেলে মনগড়া মামলায় নিল ফুলা জখম লিখেছেন, যার কারনে আটক মামলার এক নম্বর আসামী কোর্টে তোলার পরই জামিন হয়ে গেছে। তিনি আসামীর পক্ষে কাজ করছেন।
এ ব্যপারে মামলা তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) অজয় চক্রবর্তী জানান, অভিযোগ লিখেছেন বাদী, ওসি’র নির্দেশে তদন্তভার আমার উপর। এখানে দাতভাঙ্গা বা কাটা ছেড়ার বিষয়ে তদন্তে প্রমানীত হলে তা চার্জশীটের প্রতিবেদনে উল্লেখ করব। আমি বাদীকে বলেছি তুমি ভেন চালিয়ে সংসার চালাও, মামলা চালাবে কি ভাবে পারলে মিমাংসায় চলে যাও।
দেবীদ্বার থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জান বলেন, দায়ের কুপ কিংবা দাত পড়ার বিষয় থাকলে অবশ্যই তা মামলায় উল্লেখ থাকবে। বিষয়টা এমন হবার কথা নয়, পুলিশ আতঙ্কে স্ট্রোক করে বাদীর মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।