ধানখেতে বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকার মাছ উৎপাদন

আহনাফ তিহামী, দাউদকান্দি।।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমি এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। একসময় বছরের অধিকাংশ সময় জলাবদ্ধতায় পড়ে থাকা এসব জমিতে এখন বছরে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার মাছ। ফলে বদলে গেছে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র।

উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন ইলিয়টগঞ্জ, আদমপুর, পুটিয়া, বাসরা, রায়পুর, সিংগুলা, লক্ষ্মীপুর ও সুহিলপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে অন্তত ১১৫টি মৎস্য প্রকল্প। এসব প্রকল্পে বছরে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন মাছ। এখানে রুই, মৃগেল, কাতলা, সিলভার কার্প, সরপুঁটি ও তেলাপিয়াসহ নানা প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকেই জমে ওঠে মাছের বাজার। পাইকারদের কাছে তাজা মাছ মেপে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সূর্যের আলোয় ঝকঝক করছে মাছের শরীর, চারদিকে হাঁকডাক আর ব্যস্ততায় মুখর পরিবেশ। পিকআপ ও ট্রাকভর্তি মাছ যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। নগদ টাকায় মাছ বিক্রি করে সন্তুষ্ট স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আগে এসব জমি জলাবদ্ধতার কারণে বছরে আট থেকে নয় মাস পতিত পড়ে থাকত। এক ফসলের বেশি উৎপাদন সম্ভব হতো না। ১৯৮৬ সালে উপজেলার বানুয়াখোলা গ্রামের সুনীল কুমার রায় প্রথম প্লাবনভূমিতে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ শুরু করেন। তার পথ অনুসরণ করে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আজকের এই বিশাল মৎস্য খাত।

মৎস্য প্রকল্প পরিচালক ও স্বত্বাধিকারী মো. নুরুদ্দীন আহমেদ জানান, গত আট বছর ধরে তিনি মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত। ছোট পরিসর থেকে শুরু করে বর্তমানে প্রায় ৬০০ বিঘা জমিতে তার প্রকল্প বিস্তৃত। তিনি বলেন, যেসব জমিতে আগে এক ফসল হতো, সেগুলো এখন মাছ চাষের আওতায় এসেছে। তবে মাছের খাবারের দাম তিনগুণ বেড়ে যাওয়ায় লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার যদি এই খাতে নজর দিত এবং সিন্ডিকেট ভেঙে দিত, তাহলে আমরা আরও ভালো অবস্থানে যেতে পারতাম।

চারবার জাতীয় পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক মতিন সৈকত বলেন, একই জমিতে ধান ও মাছ দুই ধরনের চাষ এখন দাউদকান্দির বাস্তবতা। আগে যেসব প্লাবনভূমি পরিত্যক্ত ছিল, এখন সেগুলো দেশের মডেল মৎস্য অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এই খাতের সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মানুষ জড়িত। তিনি আরও বলেন, খাদ্যের দাম কমানো এবং হিমাগার স্থাপন করা গেলে এই খাত আরও এগিয়ে যাবে।

মৎস্য প্রকল্পের কেয়ারটেকার মো. রুহুল আমিন বলেন, আমরা রুই, পাঙ্গাস, কার্প ও তেলাপিয়া চাষ করি। প্রতিদিন সকাল-বিকাল দুই বেলা প্রায় ৮০ বস্তা খাবার দিতে হয়। এবার অনেক বিনিয়োগ করেছি, তবে লাভ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। সরকার যদি খাদ্যের দাম কমাত, তাহলে আমরা আরও ভালো করতে পারতাম।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, আধুনিক হিমাগারের অভাব একটি বড় সমস্যা। প্রয়োজনের সময় মাছ সংরক্ষণ করা না যাওয়ায় অনেক সময় কম দামে বিক্রি করতে হয়। এছাড়া এলাকার মৃত খালগুলো পুনঃখনন করা হলে পানি ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং উৎপাদন আরও বাড়বে।

দাউদকান্দি উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোসা. সাবিনা ইয়াছমিন চৌধুরী বলেন, মাছ চাষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যেখানে আমাদের যা প্রোডাকশন হওয়া উচিত ছিল, এর চেয়ে বেশি পরিমাণ প্রোডাকশন হয় প্লাবিত ভূমিতে। আমাদের মোহাম্মদ রহমত আলী মাছ চাষি, তিনি স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত হয়েছেন। এই স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে আমাদের বিভিন্ন চাষি বর্তমানে আরও বেশি উৎসাহিত হয়েছে এবং তারা মাছ চাষে এগিয়ে আসছে।

তিনি আরও জানান, মৎস্য খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং হিমাগার স্থাপনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে দাউদকান্দির প্লাবনভূমিতে মাছ চাষ এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়, বরং দেশের কৃষি ও মৎস্য খাতে এক নীরব বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে।