সৌদিতে নিহত সজিবের লাশের অপেক্ষায় মা, বাবাহারা আড়াই বছরের শিশু

গাজী রুবেল:

‘বাবা, বিদেশ যাইস না, দেশে কিছু কর।’ ছেলেকে বিদেশে যেতে নিষেধ করেছিলেন মা নয়ন বেগম। জবাবে সজিব বলেছিলেন, ‘মা, দেশে তো চাকরি নাই।’ পরিবারের স্বচ্ছলতার আশায় শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবে পাড়ি জমান কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বাগড়া গ্রামের মো. সজিব (২৫)। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। এখন ছেলের নিথর দেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটছে মা নয়ন বেগমের। আর বাবাকে হারিয়ে আড়াই বছরের ছোট্ট মেয়েটিও বড় হচ্ছে এক অপূরণীয় শূন্যতা নিয়ে।

সৌদি আরবে কর্মরত আল আমিন নামে এক বাংলাদেশি সজিবের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহত সজিব কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল ইউনিয়নের বাগড়া গ্রামের ছোটন মিয়ার ছেলে। জীবিকার তাগিদে কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবের জুবাইল শহরে কর্মরত ছিলেন তিনি।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর সৌদি আরবে সংঘটিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সজিব নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছালে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাগড়া গ্রামের পরিবেশ।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সজিব ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। বাগড়া মাদ্রাসা থেকে দাখিলে এ প্লাস এবং পরে সোনার বাংলা কলেজ থেকে এইচএসসিতেও এ প্লাস পেয়েছিলেন তিনি। ধর্মীয় অনুশাসনও মেনে চলতেন; নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন।

জীবিকার তাগিদে কয়েক বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান সজিব। ফ্রি ভিসায় সেখানে গিয়ে নির্দিষ্ট কোনো পেশায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না। যখন যে কাজ পেতেন, সেটিই করতেন। পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনের আশায় প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করতেন তিনি।

ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা নয়ন বেগম। তিনি বলেন, ‘আমি আমার পোলারে কইছিলাম, বাবা বিদেশ যাইস না, দেশে কিছু কর। তখন আমার পোলা কইছিল, মা, দেশে তো চাকরি নাই।’

নয়ন বেগম বলেন, ‘আমার পোলা অনেক ভালো ছাত্র ছিল। সে বাগড়া মাদ্রাসা থেকে এ প্লাস পাইছে। পরে সোনার বাংলা কলেজ থেকেও এ প্লাস পাইছে। আমার পোলা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। তার আড়াই বছরের একটা মেয়ে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রায় নয় মাস আগে আমার পোলা তিন মাসের ছুটিতে দেশে আসছিল। ছুটি শেষ করে আবার বিদেশে চলে যায়। তাকে ফ্রি ভিসায় পাঠানো হয়েছিল। সেখানে যখন যে কাজ পাইছে, সেই কাজই করছে। টাকা কামাই করার জন্য আমার পোলা কত কষ্ট করছে, তা আমি জানি।’

কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা নয়ন বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার কলিজার টুকরাটারে আমি আর কোথায় পামু স্যার? কত মানুষ আসে-যায়, কিন্তু আমার সজিব তো আসে না।’

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আমার পোলা আমার কাছে আর কোনোদিন ফিরবে না—এই কথা আমি কীভাবে মেনে নেব? আমার কলিজার টুকরারে একবার চোখের সামনে দেখতে চাই।’

সজিবের মৃত্যুর খবরে সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছে তাঁর পরিবার। বাবাকে হারানো আড়াই বছরের শিশুটি এখনো বুঝতে পারছে না, তার বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। স্বজনদের ভাষ্য, যে বয়সে বাবার হাত ধরে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই বাবাকে হারিয়ে বড় হতে হবে শিশুটিকে।

স্বজনরা জানান, পরিবারের স্বচ্ছলতার আশায় বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন সজিব। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি একজন প্রিয় মানুষকে হারানোর পাশাপাশি হারিয়েছে পরিবারের অন্যতম উপার্জনক্ষম সদস্যকে।

এদিকে সজিবের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। দ্রুত মরদেহ দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর ও দাফনের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন স্বজনরা।

সজিবের মৃত্যুর খবরে বাগড়া গ্রামে নেমে এসেছে শোকের আবহ। বাড়িতে স্বজনদের ভিড়, চারদিকে কান্নার শব্দ। তবে সবচেয়ে ভারী হয়ে আছে মা নয়ন বেগমের বুক। যে মা একদিন ছেলেকে বলেছিলেন, ‘বিদেশ যাইস না বাবা’—আজ সেই মা-ই অপেক্ষা করছেন প্রিয় সন্তানের নিথর দেহের জন্য।