কুমিল্লায় আবেগ-উচ্ছ্বাসে পালিত রাখি বন্ধন উৎসব

তাপস চন্দ্র সরকার।।
ভাই-বোনের চিরন্তন ভালোবাসা, মমতা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার প্রত্যয় নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আবেগঘন আয়োজনে পালিত হয়েছে পবিত্র রাখি বন্ধন বা রাখি পূর্ণিমা উৎসব।

২৮ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা মহেশাঙ্গণে জেলা ঐক্য পরিষদ নেতা অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকারের পরিবারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে ভাই-বোনের ভালোবাসার এক অনন্য আবহ তৈরি হয়। পরিবারের একমাত্র মেয়ে অর্পিতা সরকার তৃপ্তি তাঁর ছোটভাই অরন্য সরকার প্রিন্সের কব্জিতে রাখি পরিয়ে দিয়ে তার দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য, সুখ-সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্য কামনা করেন। এ সময় ভাইও বোনের পাশে থাকার এবং তাকে সব বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

রাখি বন্ধনের এই আবেগঘন মুহূর্তে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সৃষ্টি হয় আনন্দ, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার এক অপূর্ব পরিবেশ। রাখির থালায় ছিল রাখি, মিষ্টি, প্রদীপ, সিঁদুর, লাল সুতো, ধান ও দূর্বা। নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বোন যখন ভাইয়ের হাতে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে রাখি বেঁধে দেন, তখন পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আবেগ ও আনন্দের আবহ।

উৎসব উপলক্ষে পরিবারের সবাই একত্রিত হয়ে বিশেষ খাবারের আয়োজন করেন। ছিল পরস্পরকে উপহার দেওয়ার পাশাপাশি হাসি-আনন্দ, গল্প-আড্ডা ও পারিবারিক মিলনমেলা। ব্যস্ত জীবনের নানা ব্যস্ততা ভুলে পরিবারের সদস্যরা এদিন একসঙ্গে সময় কাটিয়ে পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করেন এবং পারস্পরিক ভালোবাসাকে আরও গভীর করার সুযোগ পান।

রাখি বন্ধনের অন্যতম তাৎপর্য হলো—ভাই-বোনের সম্পর্ক শুধু রক্তের বন্ধনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও আজীবন পাশে থাকার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়েই এ সম্পর্ক পূর্ণতা পায়। একটি ছোট্ট সুতো যেন হয়ে ওঠে বিশাল এক আবেগের প্রতীক। সেই সুতোয় জড়িয়ে থাকে বোনের প্রার্থনা, ভাইয়ের প্রতিশ্রুতি এবং পরিবারের প্রতি ভালোবাসার অটুট বন্ধন।

হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচার অনুযায়ী, রাখি বন্ধনের সঙ্গে ‘যম’ তত্ত্বেরও একটি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, এ বিশেষ দিনে ভাইয়ের ওপর অশুভ প্রভাব বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তবে বোনের ভালোবাসা ও রাখি বন্ধনের পবিত্রতার মাধ্যমে সেই অশুভ শক্তি দূর হয়ে ভাইয়ের মঙ্গল ও দীর্ঘায়ু নিশ্চিত হয়—এমন বিশ্বাস যুগ যুগ ধরে প্রচলিত রয়েছে।

রাখি বন্ধন বা রাখি পূর্ণিমা মূলত ভাই-বোনের পবিত্র সম্পর্কের এক নিবিড় উদযাপন হলেও বর্তমানে এর পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। জাতি, বর্ণ ও ধর্মের বিভাজন অতিক্রম করে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার প্রতীক হিসেবেও অনেকেই এ উৎসব পালন করেন। ফলে রাখি আজ কেবল একটি সুতো নয়; এটি হয়ে উঠেছে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও মানবিকতার প্রতীক।

শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হওয়ায় রাখি পূর্ণিমাকে শ্রাবণী পূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস ও ধর্মীয় আচার অনুযায়ী, ঝুলন পূর্ণিমা ও জন্মাষ্টমীর মধ্যবর্তী সময়ে এ উৎসবের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। প্রতিবছরই ভাই-বোনেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন এই দিনটির জন্য। বোন ভাইয়ের হাতে রাখি পরিয়ে তার মঙ্গল কামনা করেন, আর ভাই বোনের পাশে থাকার ও তাকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন।

কালের পরিক্রমায় রাখি বন্ধন উৎসব নানা সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্যের বার্তা বহন করে আসছে। বিহারি সংস্কৃতির সঙ্গে এর ঐতিহাসিক যোগসূত্র থাকলেও পরবর্তীকালে এটি বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে মিশে যায়। বাঙালির পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে রাখি পূর্ণিমা এখন ভালোবাসা, আনন্দ ও পারিবারিক বন্ধনের একটি বিশেষ দিন।

ওই পারিবারিক আয়োজনেও যেন সেই চিরন্তন বার্তাই ফুটে ওঠে—সম্পর্ক যত পুরোনো হয়, ভালোবাসা তত গভীর হয়। একটি রাখি যেন ভাইয়ের কব্জিতে বাঁধা সুতো নয়, বরং বোনের হৃদয় থেকে উঠে আসা এক নীরব প্রার্থনা—‘তুমি ভালো থেকো, দীর্ঘজীবী হও, জীবনের প্রতিটি পথে সুখ ও সাফল্য তোমার সঙ্গী হোক।’

অন্যদিকে ভাইয়ের প্রতিশ্রুতিও ছিল তেমনি আবেগময়—জীবনের যত কঠিন সময়ই আসুক, বোনের পাশে থাকবে সে; তার নিরাপত্তা, সম্মান ও সুখের জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকবে।

এভাবেই ২৮ আগস্ট সন্ধ্যায় কুমিল্লা মহেশাঙ্গণে অর্পিতা সরকার তৃপ্তি ও অরন্য সরকার প্রিন্সের রাখি বন্ধনের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে ভাই-বোনের অমলিন ভালোবাসার এক চিরন্তন ছবি। পারিবারিক পরিসরের এই ছোট্ট আয়োজন যেন স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবনে যত সম্পর্কই আসুক, ভাই-বোনের সম্পর্কের মতো নির্মল, নির্ভরতার এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় ভরা সম্পর্ক সত্যিই বিরল।