গোমতী নদীতে বাড়ি বিলীন, নৌকার বৈঠা হাতে ৯ বছর

আহনাফ তিহামী,দাউদকান্দি।।
একসময় গোমতী নদীর তীরেই ছিল তাঁর ঘর। ছিল নিজের বসতভিটা, সংসার আর নিরাপদে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। কিন্তু নদীর প্রবল স্রোত ও ভাঙনে ২০০৯ সালে চোখের সামনেই বিলীন হয়ে যায় সব। এরপর কেটে গেছে ১৭ বছর। নিজের ভিটেমাটি আর ফিরে পাননি মো. জাকির হোসেন। এখন অন্যের জায়গায় ছোট্ট একটি দোচালা টিনের ঘরই তাঁর ঠিকানা।

নদীতে বাড়ি হারিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই নদীকেই জীবিকার অবলম্বন বানিয়েছেন জাকির। প্রায় নয় বছর ধরে গোমতী নদীতে নৌকা চালিয়ে মানুষ পারাপার করছেন তিনি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাতে থাকে নৌকার বৈঠা। এই নৌকাটিই এখন তাঁর পরিবারের একমাত্র সম্বল।

কুমিল্লার তিতাস উপজেলার দক্ষিণ নারান্দিয়া গ্রামের সরকার বাড়ির বাসিন্দা জাকির হোসেনের সংসারে রয়েছে এক কন্যাসন্তান। বাড়িঘর হারানোর পর জীবিকার তাগিদে নৌকা চালানো শুরু করেন তিনি।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) গোমতী নদী পার হওয়ার সময় জাকির হোসেনের নৌকায় ওঠার সুযোগ হয়। বৈঠা হাতে নদী পার করতে করতে তিনি শোনান নিজের জীবনের গল্প।

জাকির হোসেন বলেন, একসময় গোমতী নদীর এই জায়গাতেই আমার বাড়ি ছিল। নদীর প্রচণ্ড স্রোতে ২০০৯ সালে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও বাড়ি রক্ষা করতে পারিনি। চোখের সামনে নিজের ভিটেমাটি নদীতে চলে গেছে।

তিনি বলেন, বাড়ি হারানোর পর অন্যের জায়গায় ছোট্ট একটি দোচালা টিনের ঘর তুলে থাকছি। নিজের বলতে আর তেমন কিছু নেই। নদী আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।

জাকির জানান, প্রায় নয় বছর আগে জীবিকার তাগিদে ৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি নৌকা কেনেন তিনি। সেই নৌকায় করেই প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষ পারাপার করেন। এখন ওই নৌকাটিই তাঁর পরিবারের একমাত্র জীবিকার অবলম্বন।

নারান্দিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ নারান্দিয়া থেকে নারান্দিয়া পশ্চিমপাড় এবং নদীর পূর্বপাড় থেকে পশ্চিমপাড়ে মানুষ পারাপার করেন জাকির। নদী পারাপারের জন্য জনপ্রতি ১০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হয়। এই সামান্য আয় দিয়েই চলে তাঁর সংসার।

নদীর দিকে তাকিয়ে জাকির বলেন, নদীতে বাড়িঘর হারিয়েছি। এখনো নদীতে স্রোত আছে, ভাঙনের ভয়ও আছে। তারপরও এই নদীতেই নৌকা চালিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে।

নিজের একটি স্থায়ী ঠিকানার আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার যদি আমার দিকে একটু নজর দেয়, থাকার জন্য একটি ঘর বা জায়গা দেয়, তাহলে পরিবার নিয়ে অন্তত মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে। আমি বেশি কিছু চাই না। শুধু নিরাপদে থাকার মতো একটি স্থায়ী ঠিকানা চাই।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গোমতী নদীর ভাঙনে এ এলাকার অনেক মানুষই বসতভিটা হারিয়েছেন। কেউ অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ নদীকেই জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। জাকির হোসেন তাঁদেরই একজন। নিজের বাড়ি হারানোর পর দীর্ঘদিন ধরে নৌকা চালিয়ে মানুষের পারাপারের পাশাপাশি পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছেন তিনি।

বাড়িঘর হারানোর ১৭ বছর পরও নিজের একটি স্থায়ী ঠিকানার অপেক্ষায় জাকির হোসেন। যে গোমতী নদী তাঁর বসতভিটা কেড়ে নিয়েছে, সেই নদীতেই এখন নৌকার বৈঠা হাতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জীবন পার করছেন তিনি। নদীর স্রোতের সঙ্গে তাঁর এই লড়াই যেন ভিটেমাটি হারানো এক মানুষের বেঁচে থাকার নিরন্তর গল্প।