দাউদকান্দিতে বিদেশি ফল প্যাশন চাষ, শখ থেকে গড়ে উঠেছে আয়ের উৎস

আহনাফ তিহামী, দাউদকান্দি:

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বারোপাড়া ইউনিয়নের ইছাপুর গ্রামে লতানো সবুজ গাছের মাচায় ঝুলছে গোলাকার সবুজ ফল। কোথাও ফুটেছে ফুল, কোথাও আবার থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা ও আধাপাকা ফল। প্রথম দেখায় স্থানীয় অনেকের কাছেই ফলটি অপরিচিত। তবে ফলটির নাম প্যাশন ফল, স্থানীয়ভাবে যা আনারকলি বা ট্যাং ফল নামেও পরিচিত। দক্ষিণ আমেরিকার এই ফল এখন শখের চাষ থেকে দাউদকান্দির এক বাড়ির পুকুর পাড়ে তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা।

ইছাপুর গ্রামের মো. তাইজুল ইসলামের ছেলে মো. আবুল হাসান ফারুক পেশায় একজন দন্ত চিকিৎসক। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি গাছপালার প্রতি তাঁর রয়েছে বিশেষ আগ্রহ। সেই আগ্রহ থেকেই ২০২৪ সালের শেষ দিকে প্যাশন ফলের কয়েকটি চারা সংগ্রহ করে বাড়িতে রোপণ করেন। শুরুতে ছিল মাত্র চারটি চারা। পরিচর্যার পর সেই গাছগুলোই এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মাচাজুড়ে। তৈরি হয়েছে ছোট্ট একটি প্যাশন ফলের বাগান।

ফারুক জানান, প্রথম দিকে শখের বশেই গাছগুলো লাগিয়েছিলেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই গাছে ফুল ও ফল আসতে শুরু করলে তাঁর আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে বাগান থেকে ফল সংগ্রহের পাশাপাশি নতুন চারা তৈরিরও সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রথমে চারটি চারা দিয়ে শুরু করেছিলাম। গাছগুলো ভালোভাবে বেড়ে ওঠার পর সেখান থেকেই অনেকগুলো গাছ হয়েছে। এখন এটি ছোট একটি বাগানের মতো হয়ে গেছে। চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি গাছের পরিচর্যা করতে ভালো লাগে। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি ফল বিক্রি করেও আয় করা যাচ্ছে।

ফারুকের ভাষ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তাঁর বাগান থেকে দুই দফা ফলন পাওয়া গেছে। প্রতিবার প্রায় ৮ থেকে ১০ কেজি করে ফল সংগ্রহ করেছেন তিনি। স্থানীয়ভাবে প্রতি কেজি প্যাশন ফল ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। ফলে অল্প পরিসরের বাগান থেকেও ভালো দামের ফলন পাচ্ছেন তিনি।

প্যাশন ফলের গাছ মূলত লতানো ও বহুবর্ষজীবী। মাচা, জাল কিংবা অন্য কোনো অবলম্বন পেলে দ্রুত লতা ছড়িয়ে পড়ে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া প্যাশন ফল চাষের জন্য উপযোগী। সঠিক পরিচর্যায় গাছে ফুল ও ফল আসে এবং বাণিজ্যিকভাবে চাষেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

ফারুক বলেন, গাছ লাগানোর পর শুরুতে নিয়মিত পানি ও পরিচর্যা করতে হয়েছে। পরে লতা মাচায় উঠে গেছে। খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না। এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গাছে ফুল ও ফল পাওয়া যায়। একটি পরিণত গাছ থেকে বছরে ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

প্যাশন ফল দেখতে অনেকটা গোলাকার। কাঁচা অবস্থায় সাধারণত সবুজ থাকে। জাতভেদে পরিপক্ব ফল হলুদ বা বেগুনি রং ধারণ করতে পারে। ফলের ভেতরে রসালো শাঁস ও অসংখ্য বীজ থাকে। স্বাদে টক-মিষ্টি এবং রয়েছে আলাদা ধরনের সুগন্ধ। ফলটি সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি শরবত, জুসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশে প্যাশন ফলকে ট্যাং ফল বা শরবতি ফল নামেও ডাকা হয়।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা এবং মো. আলমগীর হোসেনর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে ফলটি তাঁদের কাছে অপরিচিত ছিল। গাছের মাচায় ঝুলে থাকা গোলাকার ফল দেখে অনেকেই কৌতূহলী হয়ে বাগানে আসছেন। কেউ কেউ ফলের স্বাদ নিচ্ছেন, আবার কেউ নিজের বাড়িতে চাষের ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

দেশে প্যাশন ফলের চাষ এখনো সীমিত হলেও বিভিন্ন অঞ্চলে ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটছে। কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শৌখিন ফলচাষি ও নার্সারি উদ্যোক্তারা এ ফলের চাষ করছেন।

কৃষি সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্যাশন ফলের গাছ মাচা বা ট্রেলিসের সাহায্যে বেড়ে ওঠে। পানি নিষ্কাশন ভালো এমন মাটি এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাস গাছটির জন্য উপযোগী। ফুল ফোটার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা যায়। ফলটি প্রক্রিয়াজাত করে জুস, শরবত, স্কোয়াশ, জ্যাম ও জেলিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরির সুযোগ রয়েছে।

ফারুকের বাগানে এখনো বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি। তবে অল্প জায়গায় গাছের দ্রুত বিস্তার, তুলনামূলক কম পরিচর্যা এবং বাজারে উচ্চমূল্য সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে এ ফলের চাষ বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।

ফারুক বলেন, এখনো এটিকে বড় ব্যবসা হিসেবে শুরু করিনি। শখ থেকেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু ফলন ও দাম দেখে মনে হচ্ছে, পরিকল্পিতভাবে চাষ করা গেলে এটি ভালো একটি আয়ের উৎস হতে পারে। ভবিষ্যতে বাগানটি আরও বড় করার ইচ্ছা আছে।

এ বিষয় দাউদকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিগার সুলতানা বলেন, ১৫ তারিখ পর্যন্ত চাষিদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাদের দেশি ফলের চারা দেওয়া হচ্ছে। উপসহকারীরা নিয়মিত মাঠে গিয়ে পরিচর্যার বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। নিয়মিত পরিচর্যা করলে এ ফলের উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করছি।