তাছকিয়া রহমান প্রতিভা, দেবীদ্বার।।
কুমিল্লার দেবীদ্বারে ৩ ভাইয়ের মধ্যে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুই ভাইয়ের পরিবারের চলাচলের একমাত্র রাস্তাই নয়, বাড়ির চতুরপার্শ্বে টিনের বেড়া, ঝাটা, বাঁশ ও নেটের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অমানবিক এই ঘটনাটি ঘটেছে দেবীদ্বার উপজেলার রাজামেহার ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের আব্দুল খালেকের বাড়িতে।
আপন ভাইদের মধ্যকার বিরোধ বা ভ্রাতৃকলাহের জের ধরেই এই অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।
এর ফলে গত এক বছর ধরে ওই দুই পরিবারের ১৬ জন সদস্য নিজ বাড়িতেই একরকম গৃহবন্দী অবস্থায় অত্যন্ত কষ্টকর ও মানবেতর জীবনযাপন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকালে সরেজমিনে ঘটনাস্থল যেয়ে স্থানীয় ও পরিবারগুলোর সাথে কথা বলে জানাযায়,- রাজামেহার গ্রামের বাগন বাড়ির সৈয়দ আলী নামে এক ব্যক্তি প্রায় ৫০ বছর পূর্বে ওই বাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী রাজামেহার (গোবিন্দপুর) গ্রামে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
তার ৩ ছেলে মো. আব্দুল খালেক, মো. শাহজাহান, মোহাম্মদ আলী ও ২ মেয়ে আলেখা বেগম ও কাউছার বিবি রয়েছে। এদের মধ্যে কাউছার বিবি প্রতিবন্ধী।
সৈয়দ আলী মৃতু্যর পর তার সন্তানরা বাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তি বন্টন করে নেন। বাড়ির সামনের অংশ মেঝো ভাই শাহজাহান এবং পেছনের অংশে আব্দুল খালেক ও মোহাম্মদ আলী বসবাস করে আসছেন। পরবর্তীতে মেঝো ভাই শাহজাহানের মৃত্যুর পর ২ বোনের সম্পত্তি তার অপর ২ ভাই ক্রয় সূত্রে মালিক বনে যাওয়ায় ভ্রাতৃকলহ চরম আকার ধারন করে।
একাধিকবার সালিস ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)’র বরাবরে আবেদন করেও কোন সমাধানে পৌঁছতে পারেননি।
এরই মধ্যে মৃত শাহজাহানের পরিবারের সদস্যরা তাঁর সীমানা বরাবর টিনের বেড়া দিয়ে এবং বাড়ির উত্তর পাশে নেটের বেড়া দিয়ে চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেন। বাড়ির দক্ষিন- পূর্বাংশের রাস্তা দিয়ে চলাচল করলেও ও বাড়ির মালিক আব্দুল খালেকের চাচাতো ভাই আব্দুল হাকিম ওই রাস্তাটিতে টিনের বেড়া ও ও ঝাটা দিয়ে বন্ধ করে দেন।
এবিষয়ে আব্দুল হাকিম বলেন, বাড়ির নারীদের পর্দার নিরাপত্তায় রাস্তাটি বন্ধ করতে বাঁধ্য হয়েছি।
ফলে ওই দুই পরিবারের সদস্যরা বাড়ির পেছনের পুকুর পাড় হয়ে জমির কোমর পানি ভেঙ্গে অনেকদূর দিয়ে ঘুরে সড়কে উঠতে হয়।
ভুক্তভোগী পরিবার দুটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছে বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী এবং শিশু-কিশোর। তাদের মধ্যে ছয়জন আবার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বাড়ি থেকে বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ না থাকায় প্রতিদিন তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পিঠের ব্যাগ হাতে নিয়ে বাড়ির পেছনের নিচু জায়গার কোমর সমান পানি সাঁতরে প্রধান সড়কে উঠতে হয়। এরপর সেখানে ভেজা কাপড় বদলে স্কুলের পোশাক পরে তবেই তারা বিদ্যালয়ে যেতে পারে।
রাস্তার অভাবে বরপক্ষ বাড়িতে আসতে না পারায় মোহাম্মদ আলীর বিবাহযোগ্য দুই মেয়ের বিবাহদানে অনিশ্চিত হওয়ার দাবী করেছেন তার স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম। তিনি আরো জানান, তার এক মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী, সেও নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছেনা।
শুধু পড়াশোনাই নয়, স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও থমকে গেছে তাদের। হাসপাতাল, মসজিদ, হাট-বাজার কিংবা আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তীব্র দুর্ভোগের কারণে খুব বেশি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তারা কেউই এখন আর ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।
আব্দুল খালেক (৭২) জানান, আমাদের ৩ পরিবারের ২ পরিবারে বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, শিশু কিশোরসহ সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৬ জন। এদের মধ্য ৬ শিশু, কিশোর- কিশোরী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাই স্কুলের শিক্ষার্থী। বাড়ির পেছন দিক দিয়ে কোমরপানি ভিজে সড়কের উপর উঠতে হয়। পরে কাপড় পাল্টে স্কুল ড্রেস পড়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। হাসপাতাল, মসজিদ, হাট-বাজারসহ স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে পারছিল। সমাজ, প্রশাসনের নিকট আবেদন করেও প্রতিকার পাচ্ছিনা। বেড়া তুলতে গেলে আমার মেঝোভায়ের পরিবারের লোকজন হামলা তালায়, আমার ঘরের ভিটির মাটি কেটে নিয়ে যায়।
অভিযুক্ত মৃত শাহজাহানের ছেলে মোজাহিদ ও মেয়ে সালমা বেগম জানান, আমার বাবা মৃতু্যর পর চাচা- জেঠা জুলুম করে। আমাদের প্রতিদ্বন্দী ফুরফুকে আমরাই লালন পালন করেছি, দাদীর মৃতু্যর পর ফুফুকে তারা নিয়ে যায় এবং তার প্রাপ্য সম্পত্তি আমাদের বাদ দিয়ে গোপনে ২ চাচার নামে লিখে নেয়। আমাদের দুই শতাংশ জায়গা দখল করে বড় চাচা ঘর তুলেন, ওই জায়গা উদ্ধারে চাচার ঘরের ভিটির মাটি কেটেছি। প্রতিবন্ধী ফুফুর সম্পত্তির হিস্যা পেতে রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছি।
এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফয়সল উদ্দিন বলেন, অভিযোগ আমার হাতে এখনো পৌছায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেব।