তাপস চন্দ্র সরকার।।
বন্ধুত্ব শুধু হাসি-আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার নাম নয়; বন্ধুত্ব মানে সুখের দিনে পাশে থাকা, আর দুঃখের দিনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো। জীবনের কঠিন সময়ে একজন আরেকজনের হাত শক্ত করে ধরে রাখাই সত্যিকারের বন্ধুত্বের পরিচয়। আর সেই বন্ধুত্বের উজ্জ্বল ও মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলার ‘মতলব এসএসসি ব্যাচ ১৯৯৫’।
প্রিয় বন্ধু প্রয়াত লিপি আক্তারকে ভুলে যায়নি তার সহপাঠী ও বন্ধুরা। মৃত্যুর পরও বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতার জায়গা থেকে তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় আয়োজন করা হয়েছে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল।
এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয়েছে—সময় পেরিয়ে গেলেও সত্যিকারের বন্ধুত্বের বন্ধন কখনো মুছে যায় না। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) পবিত্র জুমার নামাজের পর মতলব উত্তর উপজেলার বড় হলদিয়া দক্ষিণপাড়ায় অবস্থিত বড় হলদিয়া বোরহানুল উলুম ফোরকানিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসাসহ আরও তিনটি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এ মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ‘মতলব এসএসসি ব্যাচ ১৯৯৫’-এর বন্ধুরা এ আয়োজন করেন। মাহফিলে প্রয়াত লিপি আক্তারের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
একই সঙ্গে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়। দোয়া শেষে উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অন্যান্যদের জন্য খাবারেরও আয়োজন করেন ব্যাচের বন্ধুরা। নাউরী আহম্মদীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৯৫ ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন লিপি আক্তার। দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করেছেন তিনি। অসুস্থতার খবর পাওয়ার পর থেকেই তার পাশে দাঁড়ান ‘মতলব এসএসসি ব্যাচ ১৯৯৫’-এর বন্ধুরা। বন্ধুত্বের দায়বদ্ধতা থেকে ব্যাচের সকল বন্ধু নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী লিপি আক্তারের চিকিৎসা ও বিভিন্ন প্রয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। কঠিন সময়ে তাকে সাহস জোগান, পরিবারের পাশে দাঁড়ান এবং সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু জীবন-মৃত্যুর কঠিন বাস্তবতায় শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ করে গত ৩ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন প্রিয় বন্ধু লিপি আক্তার। তার চলে যাওয়ার সংবাদে শোকের ছায়া নেমে আসে ব্যাচের বন্ধুদের মাঝে। যে মানুষটির সঙ্গে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়—কৈশোরের স্কুলজীবন—কাটিয়েছেন, সেই বন্ধুকে হারানোর বেদনা তাদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে। স্কুলজীবন শেষ হওয়ার পর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। জীবনের প্রয়োজনে কেউ হয়েছেন কর্মজীবী, কেউ সংসারী, কেউবা ছড়িয়ে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সময়ের স্রোতে প্রতিদিনের দেখা-সাক্ষাৎ কমেছে, কিন্তু বন্ধুত্বের টান কমেনি। লিপি আক্তারের অসুস্থতার সময় যেমন বন্ধুরা তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনি মৃত্যুর পরও তাকে স্মরণ করে তার জন্য দোয়ার আয়োজন করেছেন। শুধু নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করানো হয়েছে।
এ যেন বন্ধুত্বের এমন এক অধ্যায়, যেখানে কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা নেই—আছে শুধু ভালোবাসা, স্মৃতি আর প্রিয় মানুষটির জন্য শেষ পর্যন্ত কিছু করার আকুলতা।
প্রয়াত লিপি আক্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে তার স্বামী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ও ছোট বোন ‘মতলব এসএসসি ব্যাচ ১৯৯৫’-এর বন্ধুদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তারা বলেন, লিপি আক্তারের অসুস্থতার সময় বন্ধুরা যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন এবং সাহস জুগিয়েছেন, তা কখনো ভোলার নয়। মৃত্যুর পরও তার জন্য দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করায় পরিবারের পক্ষ থেকে তারা সকল বন্ধুর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে তারা লিপি আক্তারের আত্মার মাগফিরাতের জন্য সকলের কাছে দোয়া কামনা করেন। লিপি আক্তারের মৃত্যু হয়তো তার বন্ধুদের কাছ থেকে তাকে শারীরিকভাবে দূরে সরিয়ে দিয়েছে; কিন্তু স্মৃতি ও ভালোবাসার জায়গা থেকে তাকে এক মুহূর্তের জন্যও দূরে সরাতে পারেনি। বন্ধুরা মনে করেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া। লিপি আক্তারও তার সহপাঠী ও বন্ধুদের হৃদয়ে সেই জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাই তার বিদায়ের পরও বন্ধুরা তাকে স্মরণ করছেন, তার জন্য দোয়া করছেন এবং তার পরিবারের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। ‘মতলব এসএসসি ব্যাচ ১৯৯৫’-এর এই আয়োজন যেন সেই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়—মৃত্যু মানুষকে পৃথিবী থেকে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের স্মৃতি কখনো কেড়ে নিতে পারে না। ‘মতলব এসএসসি ব্যাচ ১৯৯৫’-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা শুধু আনন্দ-উৎসবের সময় নয়, জীবনের প্রতিটি সংকট ও দুঃসময়ে একে অপরের পাশে থাকার চেষ্টা করবেন। তাদের ভাষায়, “আমরা আমাদের বন্ধুদের সুখে-দুঃখে সবসময় পাশে থাকব। আপনারা সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন, আমরা যেন ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারি।” তাদের এই বক্তব্যে ফুটে উঠেছে এক গভীর অঙ্গীকার—বন্ধুত্বকে শুধু স্মৃতির পাতায় আটকে না রেখে মানবিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা। একজন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও তাকে ঘিরে বন্ধুরা একত্রিত হয়েছেন, তার জন্য দোয়া করেছেন, তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের আয়োজন করেছেন—এ দৃশ্য নিঃসন্দেহে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। আজকের ব্যস্ততা ও আত্মকেন্দ্রিকতার সময়ে এমন বন্ধুত্ব সত্যিই বিরল। জীবনের প্রয়োজনে দূরত্ব তৈরি হলেও হৃদয়ের দূরত্ব তৈরি হয়নি—‘মতলব এসএসসি ব্যাচ ১৯৯৫’-এর বন্ধুরা যেন সেটিই আবারও প্রমাণ করলেন। লিপি আক্তার আজ নেই। নেই তার হাসি, নেই সহপাঠীদের সঙ্গে সেই পুরোনো আড্ডা। কিন্তু তার স্মৃতি আছে, আছে বন্ধুদের ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে।
প্রিয় বন্ধুর জন্য বন্ধুদের এই আয়োজন তাই শুধু একটি মিলাদ বা দোয়া মাহফিল নয়; এটি বন্ধুত্বের প্রতি দায়বদ্ধতা, ভালোবাসার প্রতি সম্মান এবং মানবিকতার এক অনন্য স্বাক্ষর। লিপি আক্তারের আত্মার মাগফিরাত কামনায় উচ্চারিত অসংখ্য দোয়া পৌঁছে যাক মহান আল্লাহর দরবারে—এটাই এখন বন্ধু, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা। আর ‘মতলব এসএসসি ব্যাচ ১৯৯৫’-এর বন্ধুত্বের এই গল্প আগামী দিনেও মনে করিয়ে দেবে—সত্যিকারের বন্ধু কখনো হারিয়ে যায় না; সে বেঁচে থাকে বন্ধুর হৃদয়ে, স্মৃতিতে এবং ভালোবাসায়।