রাহাদুল ইসলাম সুজন, কুবি:
ভর্তির পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হলেও কার্ড না থাকায় তা মেনে চলা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।
সম্প্রতি কুবি শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের জেরে ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকায় আগামী কয়েকদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলার কথা জানিয়েছে প্রশাসন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে পাঁচ মাসেও প্রাতিষ্ঠানিক আইডি কার্ড না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন, পরিচয়পত্র ছাড়া ক্যাম্পাসের বাইরে চলাচলের সময় নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করতে গিয়ে তারা নানা ধরনের হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এই বিষয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরফাতুল ইসলাম ইমন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পরিচয়ের অন্যতম নিদর্শন আইডি কার্ড। আইডি কার্ড না থাকায় ক্যাম্পাসে ও ক্যাম্পাসের বাইরে, বিশেষ করে টিউশনে বা রাতে বাইরে বের হলে নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে। সামনে প্রথম সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা, অথচ ক্যাম্পাসে আসার প্রায় ৫ মাস হয়ে গেলেও আইডি কার্ড না পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা বলে মনে করি।”
লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী শাহেদুল ইসলাম বলেন, “ভর্তির প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও আইডি কার্ড না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আইডি কার্ড দেখাতে না পারায় টিউশন পেতে সমস্যা হচ্ছে, যা আমাদের অনেকেরই নিজের খরচ চালাতে জরুরি। রাতে বাইরে বের হলে শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়ারও সুযোগ থাকে না। এখন প্রক্টরিয়াল বডি পুলিশি অভিযানের কারণে আইডি কার্ড সঙ্গে রাখতে বললেও আমরা তা পাইনি। পুলিশ পরিচয় চাইলে অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানির আশঙ্কা থেকেই যায়। সামনের মাসেই প্রথম সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা, তাই পরীক্ষার আগেই আমরা দ্রুত আইডি কার্ড দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
আইন বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অর্পিতা ধর বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের প্রায় ৫ মাস হলেও এখনো আইডি কার্ড না পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন শিক্ষার্থীর জন্য আইডি কার্ড কেবল পরিচয়পত্র নয়, যেকোনো সমস্যা বা হয়রানির মুখে নিজের পরিচয় নিশ্চিতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সবাইকে আইডি কার্ড সঙ্গে রাখতে বলা হলেও, যাদের কার্ড দেওয়া হয়নি তাদের জন্য এই নির্দেশনা মানা কঠিন।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, “ক্যাম্পাসের ভেতরে সমস্যা নেই, তবে সন্ধ্যার পর প্রধান ফটকের বাইরে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড সাথে রাখতে বলা হয়েছে। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কারণে ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাঁড়াশি অভিযান চালাবে বলে আমাদের জানিয়েছে। যাদের এখনো আইডি কার্ড হয়নি, তারা শিক্ষার্থী প্রমাণের জন্য রেজিস্ট্রেশন কার্ড, এডমিট কার্ড বা যেকোনো বৈধ প্রমাণপত্র সাথে রাখবে। কোনো শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার হলে মূল ফটকে দায়িত্বরত শিক্ষক, হল প্রশাসন বা প্রক্টরিয়াল বডিকে তাৎক্ষণিক জানাতে বলা হয়েছে। এছাড়া নতুনদের আইডি কার্ডের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।”
আইডি কার্ডের বিষয় জানতে চাইলে আইসিটি সেলের পরিচালক ড. মো. মেহেদী হাসান বলেন, “শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড আইসিটি সেল তৈরি করে না, এটি হল প্রশাসনের দায়িত্ব। আইসিটি সেল মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আইডি কার্ড তৈরি করে থাকে। তাই শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড সংক্রান্ত বিষয়ে হল প্রশাসনই সঠিক তথ্য দিতে পারবে।”
কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রভোস্ট মো. হারুন বলেন, “আইডি কার্ডে ইউনিক কিউআর কোড যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের আলাদা তথ্য থাকবে। কিন্তু বর্তমানে স্ক্যান করলে সবার ক্ষেত্রেই একই তথ্য দেখাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আইটি সেলের পরিচালক এবং উপাচার্যের সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রতিটা শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিক কিউআর কোড তৈরিতে সময় ও ব্যয় সাপেক্ষ জটিলতা রয়েছে। প্রশাসন যদি আগের নিয়মেই কার্ড করার সিদ্ধান্ত দেয়, তবে এক সপ্তাহের মধ্যেই দেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে নতুন কিউআর কোড পদ্ধতিতে গেলে সময় লাগবে। আইটি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে উপাচার্যের নির্দেশনা অনুযায়ী এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের প্রভোস্ট ড. মো. জনি আলম বলেন, “ছাত্রদের হল বরাদ্দের তালিকাটি আমরা কয়েকদিন আগে পেয়েছি। এরপর হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে আজ একটি নোটিশ দেওয়া হবে। যেসব শিক্ষার্থীর এখনও আইডি কার্ড নেই অথবা যারা ফার্স্ট ইয়ার বা নবীন শিক্ষার্থী, তাদেরকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্রসহ আবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হবে। আমরা আশা করছি, আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকে আইডি কার্ডগুলো প্রিন্ট করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করতে পারব। তাছাড়া আইডি কার্ড যাদের নাই তাদেরকে প্রিন্টেড আইডি কার্ড আসার আগে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের ছাত্ররা যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে পারে সেজন্য হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাময়িক পরিচয়পত্র বা আইডেন্টিটি পেপার প্রদান করা হবে। ”