“হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে, ব্যবস্হাপনা এবং পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি এবং শারীরিক কার্যকলাপের ভুমিকা”

৮ ই সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার, বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। ২০২৬ সালের এই দিবসের প্রতিপাদ্য—হৃদরোগ ও স্ট্রোকের প্রতিরোধ, ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি ও শারীরিক কার্যকলাপের ভূমিকা। বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ(Heart Disease) ও স্ট্রোক(Stroke) মানুষের অকালমৃত্যু, দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা ও মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। তাই শুধু রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা নয়।হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধেও নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ ও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাকে স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের চিত্র উদ্বেগজনকঃ-
বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের (NCD) বোঝা দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর ৬৩.১ শতাংশ ছিল অসংক্রামক রোগের কারণে। অর্থাৎ হৃদরোগ ও স্ট্রোক বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।৭০% ই মারা যায় অসংক্রামক ব্যাধিতে এবং অসংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর ৮০ভাগই হয় স্ট্রোকের কারনে,(ইত্তেফাক ২৫ আগস্ট ২০২৫)।
গবেষণায় স্ট্রোক রোগীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি,ধুমপান, তামাক ব্যবহার, ডায়াবেটিস ও ইস্কেমিক হৃদরোগকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে পাওয়া

কেন বাড়ছে হৃদরোগ ও স্ট্রোক?
আমাদের পরিবর্তিত জীবনযাপন এ ঝুঁকি বাড়ানোর অন্যতম কারণ। দীর্ঘসময় বসে থাকা, নিয়মিত ব্যায়াম না করা, অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, ধূমপান বা তামাক ব্যবহার, অতিরিক্ত ওজন, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ কোলেস্টেরল—সবই হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।

WHO-এর মতে, তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হৃদরোগের একটি বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

প্রতিরোধে ফিজিওথেরাপির ভূমিকাঃ-
ফিজিওথেরাপি শুধু ব্যথা বা প্যারালাইসিসের চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্ট ব্যক্তির বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, রোগের ধরন, হৃদযন্ত্রের অবস্থা ও অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিলে এই রোগ গুলি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

নিয়মিত ও উপযুক্ত শারীরিক কার্যকলাপঃ-
– হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে
– রক্তচাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে
– পেশিশক্তি ও সহনশীলতা বাড়ায়;
– রক্তে শর্করা ও চর্বি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে
– দীর্ঘসময় বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব কমায়
– দৈনন্দিন কাজে সক্ষমতা ও আত্মনির্ভরতা বাড়ায়
– স্ট্রোকের পর হাঁটা, ভারসাম্য, পেশিশক্তি ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।

তবে হৃদরোগী বা স্ট্রোক রোগীর ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছামতো শারীরিক ব্যায়াম শুরু করা উচিত নয়। রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস ও শারীরিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করে একজন ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা, ব্যায়াম ও রিহ্যবিলিটেশন গ্রহণ করা নিরাপদ।

স্ট্রোকের পর পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি অপরিহার্যঃ-
স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর এক পাশের হাত-পা দুর্বল হয়ে যায়, হাঁটা ও ভারসাম্যে সমস্যা হয়, দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা কমে যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে পেশিতে শক্ত হয়ে যাওয়া, চলাফেরায় সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা দেখা দিতে পারে।

শুধু ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নয় পরিবর্তন করতে হবে জীবনযাপনও হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে আমাদের প্রত্যেকের কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন:
নিয়মিত হাঁটুন ও সক্রিয় থাকুন।
ধূমপান ও তামাক বর্জন করুন।
লবণ, অতিরিক্ত চর্বি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার কমান।
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করুন।
দীর্ঘসময় একটানা বসে থাকবেন না।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করুন।

বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, পূর্বে হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ইতিহাস রয়েছে, তাদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরিকল্পিত শারীরিক কার্যকলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথাঃ-
হৃদরোগ ও স্ট্রোক শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটি একটি পরিবার, সমাজ এবং দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে। তাই রোগ হওয়ার অপেক্ষা না করে প্রতিরোধ, সচেতনতা, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ এবং ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা যাহা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ করে তুলতে হবে।

এই বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোকঃ-
“কম বসি, বেশি চলি-হৃদয় ও মস্তিষ্ক রাখি সুস্থ”

সরকারী অধ্যাপক রূপক চন্দ্র রায়, এমফিল, লেখক ও পাবলিক হেলথ গবেষক, বিভাগীয় প্রধান- গ্রিনভিউ ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি, কুমিল্লা।
ফ্যাকাল্টি-গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক ফিজিওথেরাপি কলেজে এন্ড হেলথ সায়েন্স,সাভর,ঢাকা।