তাপস চন্দ্র সরকার।।
শত ব্যস্ততার মাঝেও একদিনের জন্য প্রকৃতির সান্নিধ্যে গিয়ে ভিন্নরকম আনন্দ ও সাংস্কৃতিক আবহে সময় কাটালেন কুমিল্লা ধর্মসাগর পাড় সুপ্রভাত মঞ্চের সদস্যরা।
শুক্রবার (২ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে কুমিল্লার লালমাই লেকল্যান্ডে মালিকপক্ষের আমন্ত্রণে আয়োজিত এ মিলনমেলা পরিণত হয় গান, আড্ডা, আনন্দ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক প্রাণবন্ত আয়োজনে।
শুক্রবার দুপুরের পর থেকেই মঞ্চের সদস্যরা একে একে কুমিল্লা টাউন হল মাঠে জড়ো হতে থাকেন। পরে বিকেল ৩টার দিকে সিএনজিযোগে লালমাই লেকল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তারা। প্রায় এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে বিকেল ৪টার দিকে তারা লালমাই লেকল্যান্ডে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছানোর পর লেকল্যান্ডের মালিকপক্ষের আবু সায়েম মোস্তফা আল আমিন অতিথিদের স্বাগত জানান।
লেকল্যান্ডে প্রবেশের পর প্রথমেই মঞ্চের সদস্যরা ঘুরে ঘুরে উপভোগ করেন সেখানকার নান্দনিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। সবুজে ঘেরা মনোরম পরিবেশ, লেকের সৌন্দর্য এবং খোলামেলা আবহে কিছুটা সময় কাটানোর পর শুরু হয় সাংস্কৃতিক আসর।
আড্ডার ফাঁকে একে একে পরিবেশিত হয় জারি-সারি, লালন সংগীত, ভাটিয়ালি ও ভান্ডারি গান। লোকজ সংগীতের সুরে পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। মঞ্চের মুখপাত্র অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী এবং কণ্ঠশিল্পী ভূষণ সূত্রধর একের পর এক গান পরিবেশন করে উপস্থিত সবাইকে মাতিয়ে তোলেন।
গানের সঙ্গে ঢোল বাজিয়ে আসরকে আরও জমিয়ে তোলেন এডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার। হারমোনিয়াম বাজিয়ে সংগীতের আবহকে প্রাণবন্ত করে তোলেন কিবোর্ড বাদক ভূষণ সূত্রধর। পাশাপাশি মঞ্চের অন্যান্য সদস্যরা ঝুরি, করতাল ও খমকসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে অংশ নিলে পুরো পরিবেশ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
গানের আসরের বিভিন্ন মুহূর্ত মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর সুমন দেবনাথ ও মোঃ সাইফুল ইসলাম। ফলে লালমাই লেকল্যান্ডের এ ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক আয়োজনের বিভিন্ন দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দর্শকদের কাছেও পৌঁছে যায়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা ধর্মসাগর পাড় সুপ্রভাত মঞ্চের সদস্য অধ্যাপক অনুকূল চন্দ্র দাশ, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অব.) প্রশান্ত কুমার ভাওয়াল, নেপাল চন্দ্র দাশ, সুজন চন্দ্র সরকার ও গৌতম দাশ। এ সময় গানের সঙ্গে অভিনয় ও নৃত্যে অংশ নিয়ে আয়োজনকে আরও আনন্দময় করে তোলেন মঞ্চের শুভাকাঙ্ক্ষী মোঃ তপন তাহের।
এদিকে লালমাই লেকল্যান্ডে ওই সময় দেশ-বিদেশ থেকে আসা ভ্রমণপিয়াসী শত শত মানুষের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি আকস্মিকভাবে এমন লোকজ সংগীতের আসর দেখতে পেয়ে অনেক দর্শনার্থীও সেখানে কিছু সময় অবস্থান করেন এবং গানের পরিবেশনা উপভোগ করেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে লেকল্যান্ডের মালিকপক্ষের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় চা-আড্ডা ও বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের আয়োজন। আড্ডা, হাসি-আনন্দ ও আন্তরিক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা। এতে বক্তব্য রাখেন মঞ্চের মুখপাত্র অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী, অধ্যাপক অনুকূল চন্দ্র দাশ, লালমাই লেকল্যান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সহ মালিকপক্ষের আবু সায়েম মোস্তফা আল আমিন।
আলোচনা সভায় বক্তারা লালমাই লেকল্যান্ডের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বিনোদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে ভ্রমণপিয়াসী মানুষকে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন নিয়ে এখানে বেড়াতে আসার আহ্বান জানান। তারা বলেন, ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটানোর বিকল্প নেই। পরিবার-পরিজন ও প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগের জন্য লালমাই লেকল্যান্ড হতে পারে একটি আনন্দদায়ক ভ্রমণস্থল।
বক্তারা আরও বলেন, সাংস্কৃতিক চর্চা ও ভ্রমণ মানুষের মনকে প্রফুল্ল রাখার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে যেমন সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ তৈরি হয়, তেমনি ব্যস্ততার জীবনে একসঙ্গে কিছু আনন্দঘন সময় কাটানোর সুযোগও সৃষ্টি হয়।
দিনব্যাপী নয়, মাত্র কয়েক ঘণ্টার এ আয়োজন হলেও জারি-সারি, লালন, ভাটিয়ালি ও ভান্ডারি গানের সুর, প্রাণবন্ত বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে আনন্দ এবং চা-আড্ডায় লালমাই লেকল্যান্ডে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও লোকজ সংস্কৃতির এমন সম্মিলন উপস্থিত সবার কাছে দিনটিকে স্মরণীয় করে তোলে।
কুমিল্লা ধর্মসাগর পাড় সুপ্রভাত মঞ্চের সদস্যদের এ আয়োজন ছিল মূলত পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সাংস্কৃতিক চর্চা ও প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটানোর একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে এমন আয়োজন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে—এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেন আয়োজনে অংশ নেওয়া সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।